আশীর্বাদ
আশীর্বাদ শব্দটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। শব্দটির যদি সন্ধি বিচ্ছেদ করি তাহলে হয় আশী: + বাদ = আশীর্বাদ। যার অর্থ দাঁড়ায় শুভ কামনা বা শুভ বার্তা বা শুভ কথা অর্থাৎ কারো মংগল কামনা করা বা ইস্পিত প্রাপ্তির প্রত্যাশা পূরণের জন্য আশীর্বাদ করা বা আশীর্বাদ কামনা করা। এই আশীর্বাদ বা দোয়া যাকে ইংরেজীতে বলা হয় ব্লেসিংস্। এই "শব্দটি" আমাদের জীবনকে খুব প্রভাবিত করে। ছোটকাল হতে আমাদের মা-বাবা কে ময়-মুরুব্বীদের কাছে আশীর্বাদ চাইতে শুনেছি। তাঁরা আমাদের মংগলের জন্য মুরুব্বীদের কাছে বলতেন এভাবে যে, "আমার ছেলেকে একটু আশীর্বাদ করবেন"। আমরা ও আমাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য অনেকের কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করি। সাধারণত মুরুব্বীরা আশীর্বাদ করেন, "বড় হও", "মানুষের মত মানুষ হও", "সুখী হও", "মংগল হোক" ইত্যাদি ইত্যাদি বলে। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে আশীর্বাদের ভাষাগত তারতম্য আছে, যেমন চাকরী বা ব্যাবসা সম্পর্কিত ব্যাপারে আশীর্বাদের ভাষা হয়, "আরো উন্নতি হউক", "উচ্চ পদে আসিন হও", "সাফল্য লাভ কর" ইত্যাদি। বিয়ে শাদী বা নব দম্পতিকে আশীর্বাদ করা হয়, "দাম্পত্য জীবন সুখের হউক", "পুত্র-কন্যায় ঘর ভর্তি হউক", "বংশ বৃদ্ধি হউক" ইত্যাদি। পড়া লেখা বা পরীক্ষার সময় আশীর্বাদ করে বলা হয়, "ভালমত পড়া লেখা কর", "ভালমত পরীক্ষা দাও", "ফার্ষ্ট হও" ইত্যাদি।
ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক সময় বুদ্ধের কাছে গিয়ে প্রার্থনা করে বলে আমি যেন "পরীক্ষায় মনে করে করে করে লিখতে পারি", "ভাল রেজাল্ট করতে পারি", "ভগবান বুদ্ধ আমাদের আশীর্বাদ করবেন" ইত্যাদি। এধরণের প্রার্থনার ফলে, মানসিক একাগ্রতা বেড়ে যায় এবং দৃঢ় চিত্তে ভালমত পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়। আর শিক্ষকদের আশীর্বাদ হল অনেকটা এরকম, "ভালমত পরীক্ষা দেয়, নিশ্চয় ভাল রেজাল্ট আসবে" ইত্যাদি। অফিসে চাকরীর ক্ষেত্রেও অফিস বস্ এর আশীর্বাদ বা দোয়া প্রয়োজন, কারণ বস্ এর দোয়া ছাড়া প্রমোশন বা বিদেশে কোন ট্রেনিং পাওয়া যায় না। বস্ যাকে বেশী বেশী দোয়া করেন সে তত বেশী সুযোগ সুবিধা পায়। তাই বস্ কে সালাম দিয়ে বলতে হয় "বস্ দোয়া করবেন"। অফিসের বস্ কোন আধ্যাত্বিক ব্যাক্তি না হলেও তাঁর দোয়া ছাড়া উন্নতি সম্ভব হয় না। যারা বস্ এর দোয়া পায় না তারা যেই তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যায়। সমাজ-সংগঠনেও পদ-পদবীর জন্য অনেক সময় অনেককে অনেকের আশীর্বাদ পুষ্ট হতে দেখা যায়।
কারো বিয়ে শাদী ঠিক হলে বিয়ের পূর্বে বস্ত্রালংকার দেয়া হয় যাকে আমরা বলি আশীর্বাদ অনুষ্ঠান। হবু বর-কনের দুই পরিবারের পারিবারিক সিদ্ধান্তের পর উভয়ের আত্মীয়-স্বজনদের উপস্থিতিতে তাদেরকে আশীর্বাদ প্রদান করা হয়। আবার বিয়ে অনুষ্ঠানে যে উপহার সামগ্রী দেয়া হয়, সেই উপহার সমূহ আশীর্বাদ স্বরূপ প্রদান করা হয়। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ পট পরিবর্তনের সময় শ্রদ্ধা বা স্নেহের নিদর্শন স্বরূপ সামান্যতম উপহার দেয়া হয়। এই উপহার শুধু বস্তুগত উপাদান নয়, এটা বিয়ে অনুষ্ঠানের সামাজিক বা বৈবাহিক যে বন্ডিংস্, তার স্বীকৃতি ও বিয়ে অনুষ্ঠানের একটা ইন্ডিভিজুয়েল স্যুভিন্যূর। বর্তমান সময়ে অনেকে বিয়েতে এই উপহার নিতে চান না। যারা এই উপহার নিতে চান না, তারা নিমন্ত্রণ পত্রে উল্লেখ করে দেন, "উপহার নয়, দোয়াই কাম্য বা আশীর্বাদই কাম্য"।
পূজনীয় ভিক্ষুসংঘের কাছে যখন আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়, তখন উনারা আশীর্বাদ করেন মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে। যেমন "ইচ্ছিতং পত্থিতং তুয্হং খিপ্পমেব সমিজ্বতু, ... চত্তারো ধম্মা বড্ঢন্তি আয়ু বণ্ণো সুখং বলং"। অর্থাৎ দায়ক-দায়িকা ও উপাসক-উপাসিকার আয়ু, বর্ণ, সুখ, বল লাভের জন্য ভিক্ষুসংঘ আশীর্বাদ করেন। এই আশীর্বাদ শব্দটির বিপরীত শব্দ হচ্ছে অভিশাপ আর দোয়া-র বিপরীতে বর-দোয়া। অভিশাপ বা বরদোয়া কেউ চায় না, তারপরও অনভিপ্রেত ভাবে অনেকেই অভিশাপগ্রস্ত বা বরদোয়া প্রাপ্ত হয়। নৈতিকতা হচ্ছে মানুষের বড় গুণ। মানুষ সব সময় ভালো যে কোন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং মন্দের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে, কিন্তু যে কোনো কারনে মানুষ যদি নৈতিকতা বিবর্জিত হয়ে যায়, প্রতিশোধ পরায়ণ হয়, সামান্য ক্ষমতা পেয়ে নিজেকে ভুলে যায় তখন সে নিজেই নিজের অজান্তে অভিশাপগ্রস্ত হতে থাকে। আমরা কেউই মনে প্রাণে অভিশাপ চাই না, চাই আশীর্বাদ। আশীর্বাদই হউক আমাদের পথ চলার পাথেয়।
আমরা জানি, আজ হতে চারি অসংখ্য লক্ষ্য কল্প পূর্বে আমাদের গৌতম বুদ্ধ সুমেধ তাপস অবস্থায় দীপংকর বুদ্ধের পাদমূলে বুদ্ধত্ব প্রার্থনা করেছিলেন এবং দীপংকর বুদ্ধ আশীর্বাদ করেছিলেন ভবিষ্যতে তিনি বুদ্ধ হবেন। এই আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়ে সুমেধ তাপস ভাবলেন বুদ্ধগণ অব্যর্থবাদী, তাঁদের বাক্য ব্যর্থ হয় না, প্রাত্যহিক সূর্য্যের উদয়-অস্ত যেমন নিশ্চিত তেমনি বুদ্ধগণের আশীর্বাদ বা বাক্য ও সুনিশ্চিত, তাই তিনি মনস্থির করলেন ত্যাগপথ অবলম্বন করে সাধনার মাধ্যমে সিদ্ধিলাভ করবেন। অতএব, ছয় বছর কঠোর তপস্যা করে পারমী পূর্ণতার মাধ্যমে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন।
মহাজনক জাতকে আমরা দেখতে পাই, মিথিলার রাজনন্দিনী বিশ্বনন্দিতা সীবলী গ্রহাচার্যের কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছিলেন। গ্রহাচার্য ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন যে, এই মহাজনক জন্মে বোধিসত্ব চরম সিদ্ধি লাভ করতে পারবে না, তবু সাধন মার্গে অনেকদূর অগ্রসর হয়ে যাবেন। বহু জন্ম পরে শাক্য বংশে জন্ম গ্রহন করবেন সিদ্ধার্থ গৌতমরূপে। সেই জন্মে তিনি পূর্ণজ্ঞান লাভ করে হবেন "বুদ্ধ" এবং সেই জন্মে মিথিলার রাজনন্দিনী আবার আবির্ভূত হবেন পৃথিবীতে সু-প্রবুদ্ধতনয়া "যশোধরা" রূপে। সেই জন্মেই তাঁদের ঘরে জন্ম নেবে রাজপুত্র। সেই ভুবন বিজয়ী রাজপুত্রের নাম হবে রাহুল। গ্রহাচর্যের এই ভবিষ্যৎ বাণির পর রাজনন্দিনী গ্রহাচর্যের চরণে লুটিয়ে পড়ে বলে উঠলেন রাহুল! রাহুল! এই আশীর্বাদই করুন, আমাকে এই আশির্বাদই করুন।
বুদ্ধের প্রধান শিষ্য আনন্দের পূর্বযোগে ও দেখতে পাই আশীর্বাদের কথা। পূর্ব জন্মে যখন আনন্দ হংসবতী রাজ্যের রাজা নন্দনের ঘরে সুমন কুমার নামে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তখন পদুমোত্তর বুদ্ধের কাছে আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সুমনকুমার তিনমাসব্যাপী পদুমোত্তর বুদ্ধকে নিরলস সেবা দান করার পর প্রবারণা দিবসে পদুমোত্তর বুদ্ধ সহ প্রত্যেক ভিক্ষু কে মহাদান দিলেন, দান করলেন ত্রিচীবর। মহাদানের পর তথাগতের পাদমূলে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করলেন — "ভান্তে ভগবান, এ তিন মাসে আমি যা পুণ্যরাশি অর্জন করেছি তার প্রভাবে আমি যেন অনাগতে কোন একজন সম্বুদ্ধের প্রধান সেবক হতে পারি, এই আমার ঐকান্তিক প্রার্থনা। পদুমোত্তর বুদ্ধ দিব্যজ্ঞানে ত্রিকাল অবলোকন করে অবগত হলেন ভবিষ্যতে সুমনের প্রার্থনা ফলবতী হবে। লক্ষ্য কল্প বছর পরে জগতে আবির্ভূত হবে গৌতম সম্যক সম্বুদ্ধ এবং অপ্রতিম পুণ্যের অমিত প্রভাবে সুমন কুমার হবে সেই সম্যক সম্বুদ্ধের প্রধান সেবক এবং তাঁর নাম হবে "আনন্দ"।
রাজা মিলিন্দ ও ভিক্ষু নাগসেন সম্পর্কেও ভগবান বুদ্ধ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, "আমার পরিনির্বাণের পাঁচশত বছর পর এই দু'জন জন্মগ্রহণ করবে, আর যে সকল ধর্ম বিনয় আমি সূক্ষ্মভাবে উপদেশ দিয়েছি, তারা উভয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও উপমা যুক্তিবলে সহজ সরল স্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে। এটাও তাঁদের পূর্বজন্মের প্রার্থনা ও আশীর্বাদের ফল।
আমরা পূজনীয় বন ভান্তেকে দেখেছি, উনি সবসময় বলতেন, শুধু এম এ পাস, বি এ পাস, ইন্জিনিয়ার, ডাক্তার হলে হবে না, বুদ্ধ নির্দেশিত পথে, বুদ্ধের অনুশাসন মেনে চলতে হবে, পঞ্চশীল মানতে হবে। আমরা যখন তাঁর কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করতাম, তিনি একটা কাঠি দিয়ে ছুঁয়ে দিতেন, আমরা পুলকিত হতাম। সাধারণত মহাপুরুষগণ অনাহূত কাউকে আশীর্বাদ করেন না। ত্রিকাল অবলোকন করে যদি আশীর্বাদ ফলবতী হবে মনে করেন তাহলেই আশীর্বাদ করেন।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পিতা-মাতার আশির্বাদ। পিতা-মাতা বা পূর্ব-পুরুষগণের আশির্বাদ ব্যতিত আমরা এই পৃথিবীতে বেড়ে উঠতে পারতাম না এবং আমাদের এই মনুষ্য জীবন লাভ করাও পূর্ব জন্মের আশীর্বাদের ফল। জন্ম জন্মান্তরের আশীর্বাদ ও পূণ্য ফলের প্রভাবে, পারমী পূর্ণতার মাধ্যমে আমরা এই দূর্লভ মনুষ্য জীবন লাভ করেছি। কাজেই এই জন্মের যে কোন ভাল কাজ আমাদের পরবর্তী জীবনের কর্ম প্রবাহ সৃষ্টি করবে, আবার যদি কোন পাপ কর্ম করা হয় তাহলে অবশ্যই কষ্ট পেতে হবে। মানুষ নিজেই নিজের কর্ম ফলের ভাগীদার। নিজের সৎ কর্মের মধ্য দিয়েই আত্মশুদ্ধি করা সম্ভব। তাই প্রত্যেককেই সকল পাপ কর্ম পরিহার করে সর্বদা কুশল কর্ম সম্পাদন করতে হয়। কুশল কর্ম করলে মনে আনন্দ অনুভব হয়, চিত্ত উৎফুল্ল হয়। তারপরও অনেক সময় কর্মের বিপাক আমাদের ধর্মের পথে চলার ব্যত্যয় ঘটায়, আমরা দূর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। কাজেই জীবনে দুঃখ দূর্দশা হতে মুক্ত হওয়ার জন্য, অপায় দূর্গতি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য, নিজেকে মানুষের মত মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য, মানুষের হিতের জন্য, মানবতার কল্যাণের জন্য, সৎ পথে জীবন যাপনের জন্য, কুশল কর্ম সম্পাদনের জন্য, ধর্মের যে সুনির্দিষ্ট পথ, সে সম্যক পথে চলার জন্য মনে-প্রাণে প্রার্থনা করি সকলের আশীর্বাদ।
সব্বে সত্বা সুখীতা ভবন্তু।
লেখক পরিচিতি: প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ। সাংগঠনিক সম্পাদক চট্টগ্রাম অঞ্চল। দি ওয়ার্ল্ড বুড্ডিষ্ট আউটস্ট্যান্ডিং লীডার এওয়ার্ড, ডব্লিউ এফ বি ওয়াই থাইল্যান্ড, দি ওয়ার্ল্ড এলায়েন্স অব বুড্ডিষ্ট লিডার্স এওয়ার্ড-থাইল্যান্ড এবং মহাত্মা গান্ধী পীস এওয়ার্ড প্রাপ্ত। একজন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংঘটক।