বর্ষাবাস প্রবারণা ও কঠিন চীবর দান
আমরা বৌদ্ধরা যে সমস্ত ধর্মীয় উৎসব পালন করি তৎমধ্যে প্রবারণা ও কঠিন চীবর দান অন্যতম ধর্মীয় উৎসব এবং বর্ষাবাস হল এই প্রবারণার অনুষঙ্গ। আমরা যখনই প্রবারণার কথা বলি তখন ভিক্ষু সংঘের তিনমাসব্যাপী বর্ষাবাস যাপনের প্রসঙ্গ চলে আসে। বর্ষাবাস যাপনকারী ভিক্ষুরাই প্রবারণা করেন এবং কঠিন চীবর দান লাভের সুযোগ পান। তাই বর্ষাবাস প্রবারণা ও কঠিন চীবর দান এক সূত্রে গাঁথা।
অতীতে ভিক্ষু সংঘ বিভিন্ন বিহারে, গাছের নিচে বা বন-জঙ্গলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত এবং ভিক্ষান্নের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু যখন ঘন ঘোর বর্ষা আরম্ভ হত তখন চারিদিক পানিতে সয়লাব হয়ে যেত, রাস্তা-ঘাট থাকত অতিরিক্ত কর্দমাক্ত। তখন তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভিক্ষা করে আহার যোগাড় করা হয়ে যেত অনেক কঠিন। তাই ভিক্ষু সংঘের জন্য বিধি প্রবর্তন করা হয় যে তাঁরা বর্ষার সময় বিহারেই অবস্থান করবেন। অন্য কোথাও বিচরণ করবেন না, ব্রতচারী হবেন। বিনয়ে যে সমস্ত বিধান দেওয়া আছে তা পালন করবেন এবং এই তিন মাস শেষে প্রবারণা করবেন।
বর্ষাবাস শুরু হয় আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে, এই আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিনকে ছোট ছাদাং বলা হয়ে থাকে। ছাদাং হল বার্মিজ শব্দ যার অর্থ হল উপোসথ। এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথি বৌদ্ধ ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনে গৌতম সিদ্ধার্থ রানী মহামায়ার জঠরে অভিসন্ধি গ্রহণ করেন। ২৯ বছর বয়সে এই দিন রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করেন। বুদ্ধত্ব লাভের পর সারনাথের ঋষিপতন মৃগদাবে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদের নিকট ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র দেশনা করেন। এই দিনে তথাগত বুদ্ধ যমক ঋদ্ধি প্রদর্শন করেন। মাতা রাণী মহামায়াকে ধর্মদেশনা প্রদানের জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। ভিক্ষুসংঘ আত্মসংযম, ধর্মানুশীলন ও জীবন সাধনায় ব্রতী হয়ে তিনমাস ব্যাপী অনুধ্যানের জন্য একস্থানে অবস্থান করেন এবং মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে অধিষ্ঠান করেন:
"অহং ভন্তে ইমস্মিং বিহারে ইমং তেমাসং বস্সং উপেমি, ইধ বস্সং উপেমি" (তিন বার)।
গৃহীরাও অধিষ্ঠান করেন উপোসথ শীল অনুশীলনের জন্য। এভাবে ব্রতচারী হয়ে ভিক্ষুসংঘ ও গৃহীসংঘ 'বর্ষাবাস বা ওয়া' ধরেন। গৃহীরা সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন বস্ত্র পরিধান করে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য, বুদ্ধপূজা নিয়ে বিহারে গিয়ে সকাল বেলা উপোসথ শীল গ্রহণ করেন। যারা উপোসথ শীল নেয় না তারা প্রদীপ পূঁজাসহ পঞ্চশীল গ্রহণের মাধ্যমে বর্ষাবাস আরম্ভ করেন। আষাঢ়ী পূর্ণিমা হতে প্রত্যেক অষ্টমী অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে গৃহীসংঘ বিহারে গিয়ে অষ্টশীল গ্রহণ ও বিভিন্ন জাতক কাহিনী পঠন ও দেশনার মাধ্যমে ভিক্ষুসংঘ গৃহীদের মাঝে ধর্মসুধা বিতরণ করেন।
ভাদ্র পূর্ণিমা তিথিতে মধু পূর্ণিমা উদ্যাপিত হয়। ভগবান বুদ্ধ যখন পারলেয্য বনে অবস্থান করছিলেন তখন এক প্রমত্ত হস্তি কর্তৃক বুদ্ধকে সেবা করতে দেখে বনের বানরের মনে বুদ্ধকে দান দেওয়ার চেতনা উৎপন্ন হলে বানর এক মৌচাক সহ বুদ্ধকে মধু দান করেন। বুদ্ধ এ দান গ্রহণ করলে বানর আনন্দে উৎফুল্লিত হয়ে এ গাছ হতে ওগাছে লাফাতে লাফাতে গাছ থেকে নীচে পড়ে মৃত্যুবরণ করে এবং মৃত্যুর পর তাবতিংস স্বর্গে গিয়ে জন্মগ্রহণ করে। মধু পূর্ণিমার দিনে বুদ্ধ পূজা, সীবলী পূজাসহ বৌদ্ধ নর-নারীরা বিভিন্ন ভেষজ রস, বাসক পাতার রস, কলা, আখের রস, জাম্বুরা, আমলকী, হরিতকিসহ বিভিন্ন ফল, ফলের রস ও মধুসহ একই লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সাধু সাধু সাধু রবে বুদ্ধকে মধু দান করেন।
তিনমাস ব্যাপী বিভিন্ন পাপ কর্ম হতে বিরত থাকা, কুশল কর্ম সম্পাদন, হিংসা-বিদ্বেষ-উত্তেজনা পরিহার এবং স্বীয় চিত্তকে সংযত রেখে বর্ষাবাস পালন করা হয়। এ বর্ষাবাসকে 'ওয়া' মাসও বলা হয়। এ বর্ষাবাস বা ওয়া মাস দিয়ে ভিক্ষু সংঘের বর্ষগণনা করা হয়। ওয়া মাসে গৃহীরা বিয়ে-সাদী সম্পাদন হতে বিরত থাকেন এবং এই তিনমাসে কোন বিয়ে সাধারণত হয় না। কারণ বৌদ্ধ ধর্মে সকল কর্মেই চিত্তের প্রাধান্য। তাই চিত্তকে সংযত রাখাই বর্ষাবাসের মূল উদ্দেশ্য। বর্ষাবাস শেষে আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথিতে হয় প্রবারণা পূর্ণিমা। সংস্কৃত শব্দ হতে পালি প্রবারণা শব্দের আবির্ভাব। প্রবারণা পালি শব্দের অর্থ আমন্ত্রণ বা আহ্বান করা, যার বাংলা প্রতিশব্দ হল প্রবণ। এ প্রবণ মানে নত হওয়া, নম্র, বিনীত, রত, উন্মুখ বা অভিমুখ হয়ে থাকা, ধর্মের প্রতি অনুরক্ত থাকা, ধর্ম অভিমুখ থাকা ইত্যাদি। আর প্রবারণা বিভিন্ন অর্থে প্রযুক্ত হয়। যেমন: 'আশা তৃপ্তি', 'অভিলাষ পূরণ', 'শিক্ষা সমাপ্তি', 'বরণ (গ্রহণ)' ও 'বারণ (বর্জন)', 'ধ্যান শিক্ষা সমাপ্তি', 'কুশলকে গ্রহণ', 'অকুশল ত্যাগ ও বর্জন', 'আত্মশুদ্ধি', ইত্যাদি ইত্যাদি। যেহেতু তিনমাসের অধিষ্ঠান বা ব্রত শেষে এই প্রবারণা, তাই প্রবারণা সঠিক অর্থে বুঝায় ব্রত সমাপন।
ভগবান বুদ্ধ যখন শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে অবস্থান করছিলেন তখন কোশল হতে একদল ভিক্ষু বর্ষাবাস শেষে বুদ্ধের নিকট এসে কিভাবে বর্ষাবাস শেষ করলেন তা বর্ণনা করে অভিহিত করলেন, পরস্পরের সাথে বিবাদ-বিসংবাদ এড়ানোর জন্য মৌনভাব অবলম্বন করে তাঁরা ইশারা-ইঙ্গিতে কথা-বার্তা বলতেন, পরস্পর কোন বাক্যালাপ করতেন না। তখন ভগবান বুদ্ধ তা শ্রবণ করতঃ বললেন, 'হে ভিক্ষুসংঘ, একত্রে বাস করতে গেলে নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক, বাদ-বিসংবাদ হতে পারে, তাই তোমরা বর্ষাবাস শেষে পরস্পর পরস্পরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। প্রত্যেকের কোন না কোন দোষ-ত্রুটি থাকতে পারে, প্রবারণার মাধ্যমে ছোট-বড় ভিক্ষু পরস্পর দোষমুক্ত হলে শাসন ও সদ্ধর্মের শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হয়। আমি অনুজ্ঞা করছি, বর্ষাবাসকারী ভিক্ষুগণ দৃষ্ট, শ্রুত বা আশংকিত, ত্রুটি বিষয়ে পরস্পর প্রবারণা করবে।
তাই প্রবারণার দিন ভিক্ষু সংঘ বিহারে বুদ্ধের সামনে বা ভিক্ষুসীমায় অবস্থান করে প্রস্তাব করবেন মাননীয় সংঘ অদ্য প্রবারণা। যদি সংঘ মনে করেন তাহলে প্রবারণা করতে পারেন। তখন দক্ষ, সমর্থ স্থবির বা মহাস্থবির ভিক্ষু উত্তরাসংঘ দ্বারা দেহের একাংশ আবৃত করে পায়ের অগ্রভাগে ভর দিয়ে বসে কৃতাঞ্জলি হয়ে বলবে, 'অহং ভন্তে পবারেমি দিট্ঠেন বা সুতেন বা পরিসংখায় বা বদতুং অনুকম্পাং উপাদায় পস্সন্ত পটিকরিস্সামি' (তিন বার)।
দৃষ্ট, শ্রুত বা আশংকিত ত্রুটি সম্পর্কে সংঘকে প্রবারণা করছি, এরূপ কোন দোষ বা ত্রুটি থাকলে অনুগ্রহপূর্বক আমাকে বলুন। আমার মাঝেও কোন দোষ দেখলে তাও প্রতিকার করব। এভাবে দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার বলবেন। নবীন ভিক্ষু প্রবীণ ভিক্ষুকে আবার প্রবীণ ভিক্ষু নবীন ভিক্ষুকে বলবে আমারও যদি এধরনের কোন আশংকা করেন অনুগ্রহপূর্বক আমাকে বলুন আমিও অপরাধ প্রতিকার করব। তখন ভিক্ষুগণ পরস্পর অপরাধ বা দোষ স্বীকার করে পরস্পরকে প্রকাশ করবে এবং ভবিষ্যতে এধরণের অপরাধ করবেন না বলে সচেতন হবেন। একই বিহারে যদি অধিক ভিক্ষু থাকে তাহলে পরস্পর এভাবে প্রবারণা করবেন। আর যদি একজন ভিক্ষু থাকে তাহলে তিনি উপস্থানশালা, মণ্ডপ বা বৃক্ষমূল পরিষ্কার করে তাতে পানীয় জল স্থাপন করে পুষ্প, প্রদীপ জ্বেলে আসন পেতে বসে অধিষ্ঠান করবেন। অদ্য আমার প্রবারণা, আমি অন্তর দিয়ে আমার দোষ স্বীকার করছি, এবং ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হচ্ছি। এধরণের ভুল আর হবে না। এ ধরণের অধিষ্ঠানের মাধ্যমে অপরাধ বোধ হতে মুক্তি লাভ করবেন। বৌদ্ধ শাস্ত্রের প্রবারণা হল দোষ-ত্রুটি অথবা নৈতিক স্খলন দেখিয়ে দেওয়ার জন্য সনিবন্ধ অনুরোধ। প্রবারণার মাধ্যমে স্বীয় দোষ অপনোদন করা যায়। ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হওয়া যায় এবং অপরাধ হতে সজাগ থাকা যায়। গৃহীসংঘের মাঝেও পরিবারে, সমাজে ছোট-বড় সকলে পারস্পরিক এভাবে প্রবারণা করলে আত্মশুদ্ধি এবং আত্মসংযম বাড়ে। ভগবান বুদ্ধের চারি আর্যসত্য, প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, ইত্যাদি বিষয়ে যথার্থ ভাবে গ্রহণ ও অনুশীলন এবং যে ধর্ম বা নিয়ম-নীতি মানুষের কল্যাণ করে না তা বর্জনই প্রবারণার আদর্শ।
বৌদ্ধ শাস্ত্রে আশ্বিনী পূর্ণিমাই প্রবারণা পূর্ণিমা এবং এ প্রবারণা পূর্ণিমাকে বড় ছাদাং বলে। প্রবারণা পূর্ণিমার সবচেয়ে আকর্ষণ হল ফানুস উত্তোলন। চীনা কাগজ দিয়ে রঙ-বেরঙের বিভিন্ন সাইজের ফানুস তৈরি করা হয়। ফানুস উড়ানোর পূর্বে মন্ত্র দ্বারা ফানুসগুলো উৎসর্গ করা হয়। ভাল মানের তৈল মাখানো সলিতা ও মোম দিয়ে ফানুস উত্তোলন হয়। এই ফানুস প্রতিটি বৌদ্ধ গ্রামে-বিহারে, শহরে-গঞ্জে উত্তোলন করা হয়। সেদিন আকাশ পূর্ণিমার আলো ও ফানুসের আলোয় অত্যন্ত ঝলমল ও উৎফুল্ল হয়ে উঠে। আর নিজের অজান্তে মনের মধ্যে অনুরণিত হতে থাকে 'আলো আমার আলো ওগো আলোয় ভুবণ ভরা'। কি সুন্দর মধুময় পূর্ণিমা রাত্রি, চারিদিকে উৎসবের অপূর্ব এক আমেজ। ২৯ বছর বয়সে কুমার সিদ্ধার্থ যখন গৃহত্যাগ করেন তখন তাঁর রাজ আভরণ, পাদুকা, মাথার মুকুট, তলোয়ার পরিত্যাগ করেন। তলোয়ার পরিত্যাগের আগে মাথার চুল কেটে হাতে নিয়ে সত্যক্রিয়া করেছিলেন যে, আমি যদি আমার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হই তবে আমার হাতের এই চুল শূন্য উড়িয়ে দিলে আর নিচের দিকে না এসে ঊর্ধ্ব দিকে উঠে যাবে। যেহেতু তিনি বোধিসত্ত্বরূপে বিভিন্ন জন্ম পরিগ্রহ করে শেষ জন্মে বুদ্ধত্ব লাভের প্রাক্কালে এই সত্যক্রিয়া করেছিলেন, তাঁর সত্যক্রিয়া ফলপ্রসূ হয়েছিল। বৌদ্ধরা মনে করেন সেই চুল ধাতু এখনও শূন্যে ভাসমান আছে। সেই চুল ধাতুকে পূঁজা ও বন্দনা করার জন্য এই ফানুস বাতি উড়ানো। ফানুস বাতি উড়ানোর সময় বৌদ্ধ সংকীর্তন, বিভিন্ন বাজনা, মাঙ্গলিক ধ্বনি, সূত্রপাঠ, বিভিন্ন গাথা ও সাধু সাধু ধ্বনির মাধ্যমে বুদ্ধের চুল ধাতুকে বন্দনা নিবেদন করা হয়।
প্রবারণার পরদিন হতে শুরু হয় মাসব্যাপী কঠিন চীবর দানোৎসব। প্রত্যেক গ্রামে প্রত্যেক বিহারে যেখানে বর্ষাবাস গ্রহণ করা হয়েছে, প্রবারণা উদ্যাপিত হয়েছে সে সমস্ত বিহারে কঠিন চীবর দান দেওয়া হয়। কারণ বর্ষাবাসের পর বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘকে নির্দেশ দিয়েছিলেন — 'চরথ ভিক্খবে চারিকং বহুজন হিতায় বহুজন সুখায় দেসথ ভিক্খবে ধম্মং আদি কল্যাণং, মঝ্ঝে কল্যাণং, পরিযোসনা কল্যাণং'। হে ভিক্ষুগণ তোমরা বহুজনের হিতে, বহুজনের সুখে, বহুজনের কল্যাণে, দিকে দিকে ছড়িয়ে পড় এবং প্রত্যেক বিহারে বিহারে সমবেত হয়ে সে ধর্ম প্রচার কর যে ধর্মের আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ, অন্তে কল্যাণ।
তিনমাস ব্যাপী শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার অনুশীলন ও বর্ষাবাস যাপনের পর সমস্ত ভুল-ত্রুটি অপনোদন করে যা কিছু ভাল, যা কিছু কল্যাণকর, যা কিছু শুভ তা প্রকৃষ্টরূপে বরণ করে এবং যা কিছু অকল্যাণকর, খারাপ তা বর্জনের মাধ্যমে প্রবারণা করে, সেই শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার কথা, কল্যাণের কথা এই কঠিন চীবর দানানুষ্ঠানে মানুষের মাঝে ভিক্ষুসংঘ দেশনা করবেন।
ভিক্ষুসংঘ যেসমস্ত বস্ত্র ব্যবহার করে বা পরিধান করে তা হচ্ছে চীবর। ভিক্ষুরা বিভিন্ন স্থান হতে সংগ্রহ করা কাপড় থেকে নিজেরা তৈরি করে চীবর পরিধান করতেন। পরবর্তীতে বুদ্ধের ২০তম বর্ষাবাস কালে রাজগৃহে অবস্থানের সময় তাঁর প্রিয় চিকিৎসক জীবক প্রথমে বুদ্ধকে চীবর দান করেন। বুদ্ধ এই চীবর গ্রহণ করতঃ নির্দেশ দিয়েছিলেন, হে ভিক্ষুসংঘ আজ হতে তোমরা গৃহীদের প্রদত্ত চীবর গ্রহণ করবে। চীবর ও কঠিন চীবর দানের মধ্যে পার্থক্য আছে। কঠিন চীবর দান নানাবিধ কারণে কঠিন যা অন্যান্য দান হতে সম্পূর্ণ আলাদা।
প্রথমত: যে বিহারে ভিক্ষু বসবাস করে 'ওয়া' ধরেছেন সেই বিহারে কঠিন চীবর দান হতে পারে অর্থাৎ নির্দিষ্ট স্থানে ভিক্ষুকে অবস্থান করতে হয়। বর্ষব্রত পালনকারী ভিক্ষুরাই কঠিন চীবর লাভের যোগ্য। দ্বিতীয়ত: একটি বিহারে একবারেই কঠিন চীবর হতে পারে। এর অধিক দান সম্ভব নয়। তৃতীয়ত: বছরের নির্দিষ্ট সময়ে অর্থাৎ আশ্বিনী পূর্ণিমা বা প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন হতে কার্তিকী পূর্ণিমার মধ্যে কঠিন চীবর দান সমাপন করতে হয়। অন্যান্য দান বছরের যেকোন সময়ে করা যায় কিন্তু কঠিন চীবর দান এ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই করতে হয়। কঠিন চীবর বুনবার ক্ষেত্রেও বিশেষ মাহাত্য আছে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে (অর্থাৎ সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত হতে পরবর্তী সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে) সুতা কেটে, রং করে, কাপড় বুনন করে, সেলাই করে শুকিয়ে চীবর তৈরি করে দান করতে হয় বলেই এই দান অন্যান্য যে কোন দান হতে কঠিন। প্রতি বৎসর প্রত্যেক বিহারে অত্যন্ত শ্রদ্ধাচিত্তে ও আগ্রহ সহকারে ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান দেওয়া হয়। ভিক্ষুসংঘের ত্রিচীবরের মধ্যে যেকোন একটি চীবর অন্তত পাঁচজন ভিক্ষুর সম্মুখে এনে — "ইমং কঠিনং চীবরং ভিক্খুসংঘস্স দানং দেমা কঠিনং অত্থরিতুং" এই মন্ত্র তিনবার উচ্চারণের মাধ্যমে কঠিন চীবর দান দেওয়া হয়। কঠিন চীবর দান গ্রহণ করে ভিক্ষুসংঘ ভিক্ষু সীমায় গিয়ে সেই চীবর বিনয় নিয়মানুসারে সীমায় (ঘ্যাংঘর) "কঠিনোত্থার কম্মবাচা" পাঠের দ্বারা কঠিনে আত্থিন্ করেন এবং বিহারস্থ উপযুক্ত ভিক্ষুকে প্রদান করেন। বিহারস্থ অন্যান্য ভিক্ষুগণ অনুমোদন করে পাঁচমাস কাল শীল বিশুদ্ধির সহায়ক পাঁচটি দানের ফল ভোগ করেন।
বস্তুদানের মধ্যে কঠিন চীবর দানের ফল অনেক বেশি। এ দানের মাহাত্য বর্ণনা করার জন্য অন্য সব দানের সাথে তুলনা করে এ দানের মহাফলের কথা বলা হয়েছে। এ দানের ফলে নরকের অপায় দুর্গতি হতে মুক্ত হওয়া যায়। নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় না, দেবলোকে ইন্দ্রিয় সুখ ভোগ সম্ভব এবং মনুষ্য লোকে মহাধনীর ঘরে জন্ম, মহাসম্পদের অধিকারী ও রাজসুখ ভোগ করা যায়। প্রত্যেক বৌদ্ধদের কঠিন চীবর দানের মহাফলের কথা চিন্তা করে জীবনে একবার অন্তত কঠিন চীবর দান দেওয়া কর্তব্য।
পরিশেষে বলতে পারি, বর্ষাবাস-প্রবারণা-কঠিন চীবর দান বৌদ্ধদের অত্যাবশ্যকীয় ধর্মীয় উৎসব এবং অন্যদিকে এ পুণ্যানুষ্ঠান একটি সাড়ম্বর সামাজিক উৎসব হয়ে আমাদের অন্তরকে উদ্বেলিত, উৎসবমুখর ও প্রফুল্ল করে।
এখানে উল্লেখ্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বা চাকরীজীবী অনেকেই নির্দিষ্ট দিনে বিহারে গিয়ে বর্ষাবাসের সময় অষ্টশীল নেওয়া সম্ভব হয় না। তাদের জন্য অষ্টমী, অমাবস্যা, পূর্ণিমা ব্যতীত অন্য ছুটির দিনে অষ্টশীল, পঞ্চশীল, স্বল্প সময়ের ধ্যানানুশীলন, ধর্ম কথার আয়োজন করলে গৃহীদের বর্ষাবাসের তাৎপর্য ও বর্ষব্রত অনুশীলনের সুযোগ হয়। অর্থাৎ এ তিনমাস বিহার কেন্দ্রিক ধর্মচর্চার মাস হিসেবে পালন করা যেতে পারে। ভিক্ষুসংঘ, গৃহীরা এই তিনমাসব্যাপী নিবিড়িত হয়ে ধর্মচর্চা ও ধর্মানুশীলনের মাধ্যমে সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে।
প্রবারণার সময় যে ফানুস বাতি উড়ানো হয় তা একদিকে ধর্মীয় আচার এবং অন্যদিকে বৌদ্ধ সংস্কৃতির একটি অংশ। বর্তমান বিশ্বে এ ফানুস বাতি উড়ানো 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' এর অংশ হিসেবে দেখা হয়। একসময় আমরা বৌদ্ধদের যখন আর্থিক সংগতি কম ছিল তখন হয়তো ১০-২০টা ফানুস উড়ানো হত। এখন আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বা ধর্মীয় চেতনা বৃদ্ধির ফলে ফানুস বাতি উড়ানো হয় ১০০, ৫০০ বা হাজারটি। ফানুস উড়ানোর আধিক্যতায় ধর্ম বা পুণ্যফল বেশি হওয়ার সুযোগ আছে কিনা জানিনা? তবে ফানুস বাতি উড়ানোর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। একসময় গ্রামে গঞ্জে কৃষি জমি, খোলা মাঠ যথেষ্ট ছিল এখন আগের মত কৃষি জমি বা খোলা মাঠ নাই। শহরাঞ্চলেও একসময় বাড়ি ঘর ছিল একতলা, দোতলা বা বড়জোড় পাঁচতলা। এখন শহরে একেকটা ২০তলা, ৩০তলার ফ্ল্যাট নির্মিত হচ্ছে। তাই আমাদের বৌদ্ধ ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করার জন্য সচেতন থাকতে হবে। আমি মনে করি ফানুস উড়ানোর ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত চিন্তাধারায় আমাদের পৌঁছাতে হবে। আমাদের ধর্ম বা সংস্কৃতিকে আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। বর্ষাবাস, প্রবারণা ও কঠিন চীবর দানোৎসবের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও এসকল অনুষ্ঠান আমরা উৎসব হিসেবে পালন করি তারপরও বলবো সমস্ত ধর্মীয় ও সামজিক অনুষ্ঠানের মূলে রয়েছে আত্মশুদ্ধি, আদর্শ ভিক্ষু সমাজ, আদর্শ গৃহী সমাজ গঠন, সমাজের ঐক্য, সৌভ্রাতৃত্ববোধ, পরহিত সাধন, সংহতি ও মহামিলন।
সব্বে সত্তা সুখীতা ভবন্তু।
লেখক পরিচিতি: প্রচার সচিব, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ। প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ যুব। প্রাক্তন কো-চেয়ারম্যান, ডব্লিউ এফ বি ওয়াই রিজোয়ানাল সেন্টারস্ ইন বাংলাদেশ। সভাপতি, শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা ও কঠিন চীবর দান উদ্যাপন পরিষদ-2024, নব পণ্ডিত বিহার, চট্টগ্রাম।