লেখার নীড়
← সব লেখায় ফিরে যান

পুষ্পিত মহাসংঘনায়ক শ্রীসদ্ধর্মভাণক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের

২ মার্চ, ২০২৬শ্রদ্ধাঞ্জলিধর্ম

আজ যাঁকে নিয়ে অন্তরের সমস্ত অর্ঘ্য দিয়ে কিছু লিখতে বসেছি, তিনি হলেন মহামান্য মহাসংঘনায়ক শ্রীসদ্ধর্মভাণক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের। এটা খুবই কঠিন ব্যাপার যে এরকম একজন মহাপুরুষ বা মহান বৌদ্ধ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে কিছু লেখা। কারণ তাঁর জ্ঞানময় কর্ম পরিধি এতই বিস্তৃত, বলা যায় মহাসাগরের মত বিশাল। কাজেই তাঁকে নিয়ে লেখা অত্যন্ত দুঃসাহসের কাজ। তারপরও তাঁর সৃজিত ও লালিত সংগঠনের একজন নিবেদিত কর্মী হিসাবে তাঁকে অন্তরের অনাবিল শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সাহস করে দু'একটা কথার অবতারণা করছি।

কথায় আছে, 'জন্ম হউক যথা তথা কর্ম হউক ভাল'। মানুষ যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন যদি তাঁর কর্ম হয় সৃজনশীল ও মানবকল্যাণে নিবেদিত, সেই কর্ম তাঁকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করে তোলে এবং এ কর্ম প্রবাহই তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্বনাগরিক হিসাবে। তখন তিনি শুধু একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির বা এলাকার মানুষ হিসেবে পরিচিত হন না, তিনি পরিচিত হন সকল কালের, সকল দেশের একজন মহান ব্যক্তি হিসেবে। তিনি সকলের কাছে হন আদরণীয়, পূজনীয় ও বরণীয়। মানব মনের চিন্তা, কথা ও কর্ম দ্বারা একজন মানুষ নিজেকে অন্যের মনের মনিকোঠায় স্থান করে নেয়।

এখানে উল্লেখ্য, মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরের একান্ত সান্নিধ্যে বা তাঁর কাছাকাছি আসার সুযোগ আমার তেমন হয়নি। যদিও তাঁর হাতে গড়া সংগঠনের সাথে নানান ভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিলাম ১৯৮০ সাল হতে যখন তাঁরই নেতৃত্বে চট্টগ্রামে প্রথম মহা বৌদ্ধ যুব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমি কাজ করার সুযোগ পাই। তখন আমি সেবমাত্র মহসীন কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হয়েছি। সেই হতে প্রত্যেক বছর নবপণ্ডিত বিহারের চীবর দান ও অন্যান্য যে কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আসতাম। সেটাও সম্ভব হয়েছে আমার শ্রদ্ধেয় ছোট মামা বাবু সমীর কান্তি বড়ুয়া'র সুবাদে। কারণ তখন তিনি ভান্তের সাথে এবং এই সংগঠনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। অনুষ্ঠানাদিতে আসলে সংঘনায়ক ভান্তেকে দূর থেকে দেখতাম, কাছে যাওয়ার সুযোগ বা সাহস হত না। আর কখনও কোন সুযোগ পেলে কাছে এসে বন্দনা করলে তিনি স্মীত হাসিতে অত্যন্ত স্নিগ্ধতায় সবাইকে জিজ্ঞাসা করতেন — "অ-সাইর তোঁয়ার বাড়ী কডে" (অর্থাৎ তোমার বাড়ী কোথায়) এখানে বলা প্রয়োজন তিনি যাদের আগে থেকে চিনতেন বা জানতেন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করতেন — "অ-সাইর বা অধন কেন আছ?" (অর্থাৎ তুমি কেমন আছ) আর যাদের চিনতেন না তাদের জিজ্ঞাসা করতেন — "অ-সাইর তোঁয়ার বাড়ী কডে, (তোমাদের বাড়ী কোথায়), তুঁই কার পোয়া (তুমি কার ছেলে) বা তোঁয়ার বাবার নাম কি? (তোমার বাবার নাম কি) ইত্যাদি ইত্যাদি। উনার এ জিজ্ঞাসার মধ্যে ছিল উদার স্নেহমাখা পরশ বুলানো এক অনাবিল প্রশান্তির ছোঁয়া। এক মহৎ প্রাণের মধুমাখা জিজ্ঞাসা যেন মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত দুঃখ, কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়। এ যেন এক মহান ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যের মাধ্যমে দুঃখকে দূর করা, সাময়িক দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করা। দূর থেকে যদি কেউ তাঁকে নিয়ে কোন ধরনের বিরূপ চিন্তা করে থাকলেও, যখনই তাঁর সামনে আসতেন তখন সমস্ত বিরূপ চিন্তা ভুলে গিয়ে তাঁর চরণে বন্দনায় নত হতেন, লুটিয়ে পড়তেন, এ যেন এক সৌম্য কান্তি, দুর্লভ মহপুরুলের দর্শন, সুঠাম দেহসৌষ্টব, মুখে পুষ্পিত হাসি, করুণা ধারায় সিক্ত কণ্ঠস্বর, অনাসক্ত এক দিব্যকান্তি, আপন শক্তিতে বলিয়ান মানবতার মূর্ত প্রতীক।

আমাদের পরিবারের প্রতি তাঁর অপরিসীম স্নেহের সম্পর্ক ছিল, আমার প্রয়াত জেঠা মহাশয়ের (প্রিন্সিপাল পি.আর. বড়ুয়া)'র সাথে তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং আমার বাবাও ঢাকার স্পেশাল ব্রাঞ্চে চাকরি করার সুবাদে সরকারী কোন আইন শৃঙ্খলার প্রয়োজনে ভান্তের সাথে যোগাযোগ ছিল। আমার বাবার কাছে শুনেছি, মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ ভান্তে ঢাকায় আসার আগে বৌদ্ধদের কোন অস্তিত্বই ছিল না ঢাকার মধ্যে। তিনি ধর্মরাজিকা টেম্পল প্রতিষ্ঠা করার কারণে বৌদ্ধরা ঢাকায় আস্তে আস্তে পরিচিতি পেয়েছে বৌদ্ধ হিসেবে। তার আগে অন্যান্য সকল সম্প্রদায়ের লোকেরা বৌদ্ধদের হিন্দু বলে মনে করতেন। আমার মুখের অন্নপ্রাশন করিয়েছেন এই মহাথের ভান্তে, ষাটের দশকের গোড়ার দিকে এই ধর্মরাজিকা ছোট পুরানো সেই বিহারে। সেই বিহারটা এখন ভেঙে অতীশ দীপঙ্কর মেমোরিয়াল করা হয়েছে। যার নিচ তলায় আমাদের বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের অফিস। আমার খুব মনে পড়ে আমার জ্যাঠতুত ভাই প্রব্রজ্যা গ্রহণের সময় তিনি আমাদের গ্রামের বাড়ীতে সংঘদানে এসেছিলেন, আবার আমার বড় দুই ভাই যখন প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে তখনও তিনি সংঘদানে আমাদের বাড়ীতে এসেছিলেন এবং ঐ সময়েই আমাদের গ্রামের 'পিংগলা মংগলা বৈদ্য বিহার'র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন উনার মাধ্যমে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে তাঁর জীবন সায়াহ্নে সর্বশেষ সংঘদানে অংশগ্রহণ তাও আমাদের বাড়ীতে।

আমার শ্রদ্ধেয় জ্যাঠামহাশয় প্রিন্সিপ্যাল পি.আর. বড়ুয়া ১৭ই জানুয়ারী ১৯৯৪ সালে পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সাপ্তাহিক সংঘদান অনুষ্ঠানে ফাং করার জন্য আমি হোয়ারাপাড়া সুদর্শন বিহারে যাই, তখন তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন এবং শারীরিক অবস্থা তেমন ভাল যাচ্ছিল না। আমি বন্দনা নিবেদন করে পরিচয় দিয়ে বললাম, ভান্তে আমি আপনাকে ২২শে জানুয়ারি আমাদের বাড়ীতে পিংগলায় আমার জ্যাঠামহাশয়ের সাপ্তাহিক সংঘদানে ফাং করতে এসেছি, ভান্তে অনুগ্রহপূর্বক আপনি ফাং গ্রহণ করুন। ভান্তের শারীরিক অবস্থা ভাল না তারপরও তিনি সম্মতি দিয়ে বললেন, 'আমি যাব'। আমি অত্যন্ত খুশিতে প্রীত হলাম। ওখানে অন্যান্য ভিক্ষু যাঁরা ছিলেন তাঁরা বললেন, ভান্তে যাবে বলেছেন ঠিকই কিন্তু দেখেন শরীরের অবস্থা কি রকম হয়? কিন্তু আমাদের পরিবারটা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান এজন্য যে তিনি ২২ শে জানুয়ারি আমাদের গ্রামের বাড়ীতে উপস্থিত হয়ে আমাদের সংঘদান অনুষ্ঠানকে মহিমান্বিত করেছেন। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত পরম প্রাপ্তি। এরপর উনি আর কোন সংঘদান অনুষ্ঠানে যেতে পারেন নি। জীবদ্দশায় এটাই তাঁর শেষ সংঘদান অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। মূলত তাঁর শারিরীক অবস্থা অনেক দিন হতে খারাপ যাচ্ছিল। দেশে-বিদেশে অনেক চিকিৎসা গ্রহণের পরও শারিরীক অবস্থার অবনতি হতে থাকে, অবশেষে মার্চ ২, ১৯৯৪ সালে দুপুর প্রায় ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে চট্টগ্রামের খ্যাতনামা হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বৌদ্ধ সমাজ গগনে একটা ইতিহাস, বৌদ্ধ রেনেসাঁ, একজন কিংবদন্তী মহাপুরুষ চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। তাঁকে হারিয়ে বৌদ্ধ সমাজ এক বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হন।

তাঁর জীবদ্দশায় তিনি দেশে বিদেশে অনেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন, অনেক অনুষ্ঠান নিজে সম্পন্ন করেছেন। স্থাপন করেছেন অনেক বৌদ্ধ বিহার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অনাথালয় ইত্যাদি। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর দূরদর্শীতার কথা ভাবলে অবাক হই। যেমন: তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠন 'বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ'। যাঁর প্রধান কার্যালয় ঢাকায় এবং গড়ে তোলেন ঢাকা ধর্মরাজিকা মহাবিহার। যে বিহারকে কেন্দ্র করে সমস্ত কর্ম পরিচালনা করা হয়। আবার যেহেতু চট্টগ্রামে অধিক সংখ্যক বৌদ্ধদের বসবাস তাঁদের ধর্মকর্ম তথা সামাজিক ও সাংস্কৃতির বিকাশের জন্য অত্যন্ত কষ্ট করে গড়ে তোলেন 'নব পণ্ডিত বিহার'। এই নব পণ্ডিত বিহারেই বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ চট্টগ্রাম অঞ্চল, মহিলা ও যুব এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবস্থিত। মুন্সিগঞ্জের বজ্রযোগিনীতে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের বাস্তুভিটায় প্রতিষ্ঠা করেন অতীশ দীপঙ্কর কমপ্লেক্স এবং বাংলাদেশের তীর্থযাত্রীদের কথা চিন্তা করে ভারতের বুদ্ধগয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন 'বাংলাদেশ বুড্ডিষ্ট মনাস্ট্রি'। তিনি স্বগ্রামের মানুষদেরও বঞ্চিত করেন নি। গ্রামের মানুষদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মেধার বিকাশের জন্য গড়ে তোলেন স্কুল, কলেজ, অনাথালয় সহ অগ্রসার মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স।

আমি তাঁর তিনটা ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। যা আমাকে এখনও নস্টালজিয়ায় ভাবিয়ে তোলে। ফেব্রুয়ারি ২৬ হতে মার্চ ৫ তারিখ ১৯৮৩ ইং অতীশ দীপংকর সহস্র বৎসর উদযাপন ও চায়না হতে অতীশ দীপংকরের যে পবিত্র এ্যাশ (দেহ ভষ্ম) আনা হয়েছিল এবং বজ্রযোগিনীতে এই এ্যাশ সংরক্ষণ করা হয়েছিল, সেই অনুষ্ঠানে ঢাকায় আমি উপস্থিত ছিলাম। ১৯৯২ সালের ২৩শে নভেম্বর ভান্তে বুদ্ধগয়ায় বাংলাদেশ টেম্পলের যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল সে অনুষ্ঠানে মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ ভান্তে ও থাইল্যান্ডের ফ্রা পানায়া বড়দি ধর্মাধিরাজসহ বহু ভিক্ষুসংঘ, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও দেশী-বিদেশী অনেক ডেলিগেটস্‌ এর উপস্থিতিতে পানিতে ডোবা নীচু স্থানকে বালি দিয়ে ভরাট করে বাংলাদেশ সহ সমস্ত পৃথিবীর মানুষের জন্য এক নতুন ঠিকানা-ধর্মশালা স্থাপনের সূচনা করা হয় এবং সেটা সম্ভব হয়েছিল মহামান্য মহাসংঘনায়কের দূরদর্শীতা ও বর্তমান প্রয়াত ২৮তম সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের'র ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে। যা বর্তমানে বুদ্ধগয়ায় বাংলাদেশ বুড্ডিষ্ট মনাস্ট্রি। সৌভ্রাতৃত্ববোধ এবং নিজেদের মাঝে নিকায়গত সম্প্রীতির অনেক দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন যেমন: ২৩ শে ডিসেম্বর ১৯৯৩ সালে ঢাকায় মহাত্মা গান্ধী পিস এওয়ার্ড প্রদান ও সম্মাননা অনুষ্ঠান এবং পরবর্তীতে ২৫ শে ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নব পণ্ডিত বিহারে যে রিসেপসান অনুষ্ঠান হয়েছিল সে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন মহামান্য সংঘরাজ শীলালংকার মহাস্থবির। এ সমস্ত অনুষ্ঠানে মহাসংঘনায়ক ভান্তে যে বক্তব্য রেখেছেন এবং সমাজের উন্নয়নের তথা সামাজিক সম্প্রীতির যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তা আমাদের এখনও অনুপ্রাণিত করে।

সারাজীবন তিনি পিছিয়ে পড়া বৌদ্ধ সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সমাজের সমষ্টিগত উন্নয়নের কথা ভেবেছেন। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন "যুব শক্তিই সকল কর্ম শক্তির উৎস", প্রবীণের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা আর নবীনদের কর্মশক্তি ও বুদ্ধিদীপ্ত চেতনার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে সমাজ এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। তাই তিনি যুব শক্তির জয়গান গেয়েছেন সবসময়। অন্যদিকে তিনি নারী শক্তির উদ্বোধন করেছেন কারণ নারীরাই একমাত্র পারে পুরুষের কর্মের প্রেরণা যোগাতে। বৌদ্ধ নারীরা সুশিক্ষিত হয়ে বিভিন্ন জনকল্যাণ মূলক কাজে নিজেরা যেমন অংশগ্রহণ করতে পারে তেমনি তাদের স্বামীদের, ছেলেমেয়েদের কাজে সাহায্য করতে পারে। নারীরা যদি সহযোগিতা না করে তাহলে পুরুষরা কর্ম উদ্যমে বা সমাজ কর্মে এগিয়ে যেতে পারে না তাই তিনি নারী সমাজকে জাগ্রত করেছেন। নারীদের বিভিন্ন সমাজ ও জনকল্যাণ মূলক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন এবং হোয়ারাপাড়া গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন মহিলা কলেজ ও অনাথালয়। তিনি বলতেন বৌদ্ধ সমাজ নিজেদের কুসংস্কারগুলো সংশোধন করে বৃহত্তর জীবন ধারায় নিজেদের সম্পৃক্ত করে প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে পারে। আর সমাজ ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘ। বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘ যত বেশি শিক্ষিত, উদার, চরিত্রবান, ত্যাগী ও মৈত্রীপরায়ন হবে ততই সমাজের মঙ্গল হবে এবং প্রতিষ্ঠিত হবে আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ভিক্ষুসংঘ। কারণ ভিক্ষু সংঘ হচ্ছে সমাজের সামনের চাকা, সামনের চাকা যদি সৎ ও নিষ্ঠাবান হয় তাহলে সমাজ ও স্বধর্ম আলোকিত হবে এবং ভিক্ষুসংঘ যদি মানব কল্যাণে আদর্শ স্থাপন করতে পারে, তাহলে গৃহীসংঘ অর্থাৎ পেছনের চাকা ও তাঁদের অনুসরণ করবে। গৃহী সমাজও হবে সচেতন, ধর্মপরায়ণ, চরিত্রবান, সুশৃংখল ও শিক্ষিত। তাহলে ভিক্ষুসংঘ ও গৃহীসংঘের সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাজ এগিয়ে যাবে। বৌদ্ধ জাতি নিজস্ব ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারবে।

অনেক সময় আমরা দেখি, স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধির জন্য হীন আচরণের মাধ্যমে সামাজিক নিয়মনীতি উপেক্ষা করা হয়। নেতৃত্বের মোহে সমাজের সামগ্রিক স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটানো হয়, তাই মহাসংঘনায়ক বলতেন, সবাই নিজেদের উৎসর্গকৃত কর্মী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করুন, তাহলে আপনাদের এই নিরলস কর্ম প্রবাহ একদিন আপনাদের নেতৃত্বের আসনে নিয়ে যাবে। নেতা হওয়া কঠিন এবং নেতৃত্ব দেওয়া আরো কঠিন। যিনি নত তিনিই নেতা, যিনি অহংকারমুক্ত তিনিই নেতা, যিনি সুবিবেচক, বুদ্ধিদীপ্ত, প্রত্যুৎপন্নমতি সম্পন্ন, স্বার্থহীন, অপরের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেন, যিনি অন্যের মতামতের মূল্যায়ণ করেন, গণতান্ত্রিক আচরণ করেন, বাগাড়ম্বর না করে অমায়িক ব্যবহার করেন, দক্ষ ও সঠিক দিক নির্দেশনা দেন তিনিই নেতা। কাজেই মনে রাখতে হবে সঠিক নেতৃত্বই জাতিকে উন্নত করতে পারে।

মহান নেতৃত্বের মহৎ গুণাবলীর অধিকারী মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের বৌদ্ধ ধর্ম, সভ্যতা ও কৃষ্টিকে দেশে-বিদেশে এক উচ্চতর অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন। বাংলার নব অতীশ খ্যাত এই মহান নেতার তিরোধান হলেও তাঁর গৃহীত সমস্ত কর্ম চিন্তা, চেতনা, দিক-নির্দেশনা আমাদের সমাজকে এগিয়ে নেয়ার পাথেয় হয়ে থাকবে। তাঁর স্থাপিত বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মজ্ঞান আহরণ ও মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। যতদিন এই বৌদ্ধ সমাজ থাকবে ততদিন তিনি আমাদের কর্ম প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। অন্তরের অপ্রতিম শ্রদ্ধা ও বন্দনায় পূঁজিত হবেন এই নন্দিত মহাপুরুষ, পুষ্পিত মহাসংঘনায়ক শ্রীসদ্ধর্মভাণক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের।

ভবতু সব্ব মঙ্গলম্‌।

লেখক পরিচিতি: প্রচার সচিব, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ। প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ যুব। প্রাক্তন কো-চেয়ারম্যান, ডব্লিউ এফ বি ওয়াই রিজোয়ানাল সেন্টারস্‌ ইন বাংলাদেশ। সভাপতি, শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা ও কঠিন চীবর দান উদ্‌যাপন পরিষদ-2024, নব পণ্ডিত বিহার, চট্টগ্রাম।