লেখার নীড়
← সব লেখায় ফিরে যান

ইঞ্জিনিয়ার খালেক ও অধ্যাপক খালেদকে যেমন জেনেছি

১০ জানুয়ারি, ২০২৬শ্রদ্ধাঞ্জলিইতিহাস

মানবশিশু জন্মের পর থেকে ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠার পথে তার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ জন্মায়। এই জানার আগ্রহটাই মানুষের মানসিক বিকাশ সাধনের অন্যতম প্রধান শক্তি। যে কোন বিষয়ে জানার কৌতূহল থেকেই মানুষের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন জাগে, আর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পথ খুলে যায় জ্ঞান অর্জনের। যার যত বেশি জানার আগ্রহ, শেখার আগ্রহ থাকে, তার তত বেশি নতুন নতুন ধারণা, অভিজ্ঞতা রপ্ত হয়। এই জানার আগ্রহ ব্যক্তিকে শুধু তথ্যসমৃদ্ধই করে না, বরং ব্যক্তির চিন্তাশক্তি, বিচারবোধ, জ্ঞান এবং সৃজনশীলতাও বৃদ্ধি করে।

যাঁরা মহাপুরুষ তাঁদের জীবনচরিত সম্পর্কে যদি আমরা জানি — তাঁদের মানবকল্যাণ, জ্ঞান, নৈতিকতা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অবদান, তাঁদের জীবন সংগ্রাম ও সাফল্যগাঁথা প্রভৃতি আমাদের জন্য শিক্ষণীয়, অনুকরণীয়। কবির ভাষায় — "মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করেছেন গমন হয়েছেন প্রাত:স্মরণীয়, সেই পথ লক্ষ্য করে স্বীয় কীর্তি ধ্বজা ধরে আমরাও হব বরনীয়"। তাঁদের অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ, নৈতিক দৃঢ়তা এবং জ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠা, আমাদের চলার পথে নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করে। একথা সত্য যে, জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ মানুষকে আলোকিত করে, আর মহাপুরুষদের জীবনচর্চা সঠিক আলোয় পথ চলতে সাহায্য করে। তাঁদের জীবন কেবল অতীতের গল্প নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা।

আজকে বাংলাদেশের দুই কীর্তিমান পুরুষ, চট্টগ্রামের আলোকিত সন্তান "ইঞ্জিনিয়ার খালেক ও অধ্যাপক খালেদকে যেমন জেনেছি" তা বলতে গিয়ে প্রথমে তাঁদের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত "দৈনিক আজাদী" পত্রিকার কথা একটু বলতেই হয়। প্রচলিত শব্দ পেপার বা দৈনিক সংবাদ পত্রের ব্যাপারে আমরা সকলেই জানি কিন্তু প্রত্যেকদিন পত্রিকা কিনে পড়েন এরকম লোকের বা পরিবারের সংখ্যা তুলনামূলক খুবই কম ছিল, বিশেষকরে সত্তর-আশির দশকে। ছাত্রাবস্থায় পকেটের টাকা দিয়ে প্রথম পত্রিকা কিনেছি এস এস সি পরীক্ষার রেজাল্ট দেখার জন্যে এবং সেই পত্রিকাটা ছিল চট্টগ্রামের "দৈনিক আজাদী"। রেজাল্ট দেখা হল, পেপার পড়াও হল কিন্তু সে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা কে বা প্রধান সম্পাদক কে ছিলেন সেগুলো জানার কোনো প্রয়োজন অনুভব করিনি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে পেপার পড়তে হলে বা চাকরির কোন বিজ্ঞাপন দেখতে হলে, যারা নিয়মিত পেপার কিনতেন তাদের কাছে গিয়ে পড়ে আসতাম। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে যখন চাকরিতে ঢুকলাম তখন বাসায় প্রতিদিন একটা পত্রিকা রাখার প্রয়োজন অনুভব করি এবং অনেক চিন্তা ভাবনা করে, চট্টগ্রামের স্হানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির খবরাখবর পাওয়ার সুবিধার কথা বিবেচনা করে প্রত্যেকদিন একটা পত্রিকা নিই। সেই সময় থেকে আজ অবধি সকাল সাতটার মধ্যে দরজার ফাঁক দিয়ে হকার একটা পত্রিকা দিয়ে যায় এবং সেই পত্রিকাটা হল "দৈনিক আজাদী"। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই দরজার ফাঁকে যখন পত্রিকাটি পাই তখন খুব পুলকিত হই। আর না পেলে হতাশ হয়ে পরের দিন হকার কে বলি দেরি হয় কেন? যেদিন পেপার বন্ধ থাকে সেদিন খুব অস্বস্তি লাগে।

ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সম্পর্কে জানার সুযোগ আসে দৈনিক আজাদীর ৩৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৯৫ সালে, ২০০১ সালে প্রফেসর মোহাম্মদ খালেদ সম্মাননা গ্রন্থ, ৫০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ২০১০ সালে এবং অধ্যাপক খালেদের মৃত্যুর পর ২০০৩ সালে। তাছাড়াও জানুয়ারি ২০২৪ সালে বাংলা একাডেমি ফেলো শিশু সাহিত্যিক রাশেদ রউফ সম্পাদিত অধ্যাপক খালেদ জন্ম শতবার্ষিক স্মারক গ্রন্থ, যেখানে অধ্যাপক খালেদ সম্পর্কে বিশদভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখন তাঁদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী ছাড়াও বিভিন্ন সভায়, আড্ডায়, আলোচনায়, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে তাঁদেরকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। কারণ এই আজাদী পত্রিকা স্বাধীনতা যুদ্ধ ও যুদ্ধ পূর্ববর্তী বা পরবর্তী সময়ে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।

"দৈনিক আজাদী" ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রথম প্রকাশিত হয়। মোহাম্মদ আব্দুল খালেক পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা, প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক। এই পত্রিকা খালেক সাহেবের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় প্রখ্যাত কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী-লিখিত ঐতিহাসিক কবিতা "কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি" কবিতাটি "কোহিনুর প্রেস" থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল। এবং এই "কোহিনুর ইলেক্ট্রিক প্রেস" প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৩২ সালে আব্দুল খালেক। তিনি অনুভব করেছিলেন চট্টগ্রামে একটি আধুনিক মুদ্রণশিল্পের প্রয়োজন। জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করতে হলে, বিভিন্ন কিছু প্রকাশ, প্রচার ও প্রসার ঘটাতে হলে প্রকাশনা শিল্প আমাদের লাগবেই। পাশাপাশি তিনি আরো অনুভব করলেন বিভিন্ন প্রকাশনা ও গবেষণা গ্রন্থ সংরক্ষণ করতে হলে প্রয়োজন লাইব্রেরির। তাই তিনি ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন "কোহিনুর লাইব্রেরি"। এখান থেকেই ১৯৫১ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে প্রকাশিত হত "কোহিনূর" নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা।

ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের এক সম্মানিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মতারিখ বিভিন্ন স্মারক ও জীবনীমূলক বইয়ের সূত্র মতে ২০ জুলাই ১৮৯৬। সেই সময়ে মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত ও শিক্ষার আগ্রহও ছিল কম। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সমাজ ছিল অনগ্রসর। তিনি নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে প্রকৌশল শিক্ষা অর্জন করে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ খাতে কাজ শুরু করেন। ১৯২০-এর দশকে চট্টগ্রাম ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানিতে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির পাশাপাশি তিনি চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তখনকার চট্টগ্রামের মানুষ তাঁকে "ইঞ্জিনিয়ার সাহেব" হিসেবে চিনতেন এবং তিনি চট্টগ্রামে নিজেকে একজন প্রথম মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

তারপরও এই প্রকৌশল পেশা তাঁকে পুরোপুরি তৃপ্ত করতে পারেনি। তিনি উপলব্ধি করতেন যে একটি সমাজের রাস্তা-ঘাট, বিদ্যুৎ বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকৃত উন্নয়ন নয়, উন্নয়নকে জ্ঞানভিত্তিক টেকসই করতে হলে প্রয়োজন জ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি প্রকাশনা শিল্প প্রতিষ্ঠা করেন এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন লাইব্রেরি ও পরবর্তীতে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। কলম ও সংবাদপত্রকে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখেছিলেন তিনি। সরকারি চাকরির নিরাপদ জীবন ছেড়ে তিনি শিক্ষা, প্রকাশনা, মানবকল্যাণ ও সমাজসেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। শিক্ষিত ও সচেতন সমাজ গঠনই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। গণমাধ্যম এবং জনমত গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দৈনিক আজাদী আজও অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী আঞ্চলিক সংবাদপত্র। ষাটের দশকে স্বাধিকার আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মানুষের মৌলিক অধিকার এবং জনমত গঠনে আজাদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইঞ্জিনিয়ার খালেক তাঁর দূরদর্শী চিন্তা ও মানবিক কর্মের চেতনা থেকেই মানবিক মর্যাদা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দৈনিক আজাদী প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর সেই চিন্তা ও চেতনার প্রতিফলন ঘটে। তাই অকপটে বলতে পারি — ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক এমন একজন ইঞ্জিনিয়ার যিনি সুস্থ-সুন্দর ও সুশিক্ষিত সমাজ নির্মাণের পথিকৃৎ, আধুনিক মূদ্রণশিল্প ও প্রকাশনা শিল্পের অগ্রদূত, দূরদর্শী ব্যক্তি, বহুমাত্রিক জ্ঞানের অধিকারী, সাংবাদিকতা বিকাশের অন্যতম কারিগর। তিনি চট্টগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ, ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চা এবং গণতান্ত্রিক চেতনাকে শক্তিশালী করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান ও একটি নব ধারার জন্ম দিয়েছিলেন। তিনি সংবাদপত্র প্রকাশ বা প্রতিষ্ঠা করার সাথে সাথে চট্টগ্রামবাসীর জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি মূল্যবোধ। তিনি সংবাদপত্রের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে সুধী সমাজে সৌজন্য সংখ্যার মাধ্যমে বহুল প্রচার করে সৃষ্টিশীল লেখক ও নন্দিত পাঠকসমাজ সৃষ্টি করেছেন। তাই তাঁকে চট্টগ্রামের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম নির্মাতাও বলা যায়।

ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক ১৯৬২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ৬৬ বছরের জীবন পরিক্রমায় তিনি বহুমাত্রিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর স্মৃতি ও অবদান চিরবহমান। তাঁর অনন্য অবদানকে চিরস্মরণীয় রাখতে তাঁর নামে চালু করা হয়েছে স্মারক বৃত্তি। প্রতি বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে "ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক-দৈনিক আজাদী বৃত্তি" প্রদান করা হয়। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে তাঁর নামে অডিটোরিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে — "ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক মিলনায়তন"। এবং আন্দরকিল্লা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সামনের রাস্তার চত্বরটিকে "ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক চত্বর" নামকরণ করা হয়।

অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় অর্থাৎ ভাগিনেয় এবং পরবর্তীতে তাঁর জামাতা হয়েছিলেন। ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেকের মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ দৈনিক আজাদীর সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে যখন দৈনিক আজাদী'র প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন তাঁর বয়স ছিল চল্লিশ বছর।

তিনি ১৯২২ সালের ৬ জুলাই ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনায় জন্মগ্রহণ করেন। তখন তাঁর পিতা কর্মক্ষেত্রের সুবাদে কিছুদিন পাটনায় ছিলেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুল হাদি ও মাতার নাম তামান্না বেগম। কিন্তু তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের "দারোগা বাড়ি"। তাঁর পিতার ছিল দুই বিবাহ। এই দুই মায়ের ঘরে তাঁরা ভাই-বোন ছিলেন দশজন। এই দশজনের মধ্যে প্রথম পাঁচজন বোন, পরবর্তী পাঁচজন ভাই। ভাইদের মধ্যে তিনি বড়।

অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ১৯৪০ সালে রাউজান আর.আর.এ.সি. ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৪২ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএ পাশ করার পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে বি এ শ্রেণিতে ভর্তি হন। উল্লেখ্য এই কলেজেই তাঁর সঙ্গে শেখ মুজিবর (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু-জাতিরজনক) রহমানের পরিচয় হয়। কলকাতায় কলেজে পড়াকালীন সময়ে তাঁর বাবা মারা যান। যার কারণে তিনি ইসলামিয়া কলেজ থেকে ট্রাস্সপার নিয়ে চলে আসেন চট্টগ্রাম কলেজে এবং ১৯৪৪ সালে বি এ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে ১৯৪৭ সালে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি 'ভারত বিভাগ চাই' আন্দোলন ও 'বৃটিশ বিরোধী' আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।

কর্মময় জীবনের শুরুতে তিনি বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করেছেন — দেশলাই, ফাউন্টেন পেন ব্যবসা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, বাঁশ ও বেতের ফার্নিচারের দোকান, ক্লিয়ারিং ফরওয়ার্ডিং, ব্রোকারিসহ অনেক ধরনের ব্যবসা কিন্তু নিজেকে সঠিকভাবে কোনো ব্যবসার সাথে খাপ খাওয়াতে পারেননি। রাউজান স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন, কিছুদিন জাহানপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, কো-অপারেটিভ ব্যাংকেও চাকরি করেছেন তারপর পেশাগত জীবন শুরু করেন নাজির হাট কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে। কলেজে শিক্ষকতা করার সময় তৎকালীন বিদেশি ব্যাংক গ্রীন্ডল্যাজ ব্যাংকে অফিসার হিসেবে যোগদান করেন এবং কিছুদিন ব্যাংকে চাকরি করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার কারণে ব্যাংকের চাকরিতে অনিয়মত হয়ে যান এবং একজন কলিগের সাথে মতবিরোধ হলে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে আবার নাজিরহাট কলেজে অধ্যাপনায় ফিরে এসে শিক্ষকতাকে মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি ১৯৫৮ সালের দিকে তিনি সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেন এবং ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ সালে দৈনিক আজাদী প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজাদী'র প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক মারা গেলে প্রধান সম্পাদক হিসেবে পত্রিকার পুরো দায়িত্ব তাঁকে নিতে হয়। ২০০৩ সালের ২১ ডিসেম্বর মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি দৈনিক আজাদী'র প্রধান সম্পাদক ছিলেন। ৪৩ বছরের সাংবাদিকতার জীবনে তিনিই একমাত্র সাংবাদিক যিনি আমরণ ৪১ বছর প্রধান সম্পাদক ছিলেন।

অনেকেই বলেন তাঁর এই দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ইচ্ছা করলে এই পত্রিকাটিকে আঞ্চলিক দৈনিক থেকে জাতীয় দৈনিকে পরিণত করতে পারতেন এবং নিজেকে রাষ্ট্রের একজন বড় মাপের সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা করেননি কারণ তিনি সবসময় চেয়েছেন আঞ্চলিক শক্তিকে সুদৃঢ় করতে। মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন আমরা স্থানীয়ভাবে যদি শিক্ষা, সংস্কৃতি, লেখা-লেখি, সাংবাদিকতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারি, তাহলে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি হবে। দৈনিক আজাদীও চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জনমুখী সংবাদপত্রে পরিণত হবে। তাঁর এই অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংবাদকে তিনি জাতীয় গুরুত্বে উন্নীত করেছেন। দৈনিক আজাদীকে পরিনত করেছেন দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ প্রতিষ্ঠানে। সাংবাদিক হিসেবে তিনি ছিলেন আপসহীন। তাঁর সম্পাদকীয় নীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল — সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন, গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা ও সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা। তিনি ছিলেন উদার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী, ধর্মীয় মনোভাব সম্পন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। কোন ধরনের সংকীর্ণতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।

তিনি অনেক সাংবাদিক তৈরি করেছেন এবং স্থানীয় সাংবাদিকতার একটি শক্তিশালী ধারা গড়ে তুলেছেন যা বর্তমানে জাতীয় ধারার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ বিশেষ ইস্যুতে তিনি এদেশের গণমানুষকে একত্রিত করেছেন। তিনি ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬'র ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণ-আন্দোলনসহ বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে চট্টগ্রামের জনমত, নাগরিক সমাজ ও সাংস্কৃতিক গণজোয়ার সৃষ্টিতে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে তৎকালীন জাতীয় পরিষদের স্পিকার ও মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করা।

তিনি ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনায় গঠিত চট্টগ্রাম সংগ্রাম কমিটির পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম একজন নেতা। ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র জয় বাংলা-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। তিনি ছিলেন নির্ভীক কলম সৈনিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা বাধা সত্ত্বেও তিনি দৈনিক আজাদী'র প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৭ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম যে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল সেই পত্রিকাটি ছিল দৈনিক আজাদী, যার শিরোনাম ছিল — "জয় বাংলা, বাংলার জয়"। যার ফলে দৈনিক আজাদী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা এবং অধ্যাপক খালেদ সেই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক — যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম একটি অংশ হয়ে রয়েছে। তিনি একদিকে চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্র শিল্প, ঢাকাকেন্দ্রিক বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের প্রভাবের মধ্যে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সংগ্রাম করছিলেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক সাংবাদিকতার মর্যাদাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৭২ সালে ৩২ সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলার গভর্নর নিযুক্ত হন। স্বাধীনতা আন্দোলন, আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ সম্পন্ন একজন ধর্মপরায়ণ, সত্যনিষ্ঠ, মিতভাষী, স্মীত হাসির দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি চট্টগ্রামের এমন একজন মহান আদর্শবান ব্যাক্তি যিনি সাংবাদিকতা, রাজনীতি, উন্নয়ন, দৈনিক আজাদী ও চট্টগ্রামের জনজীবনের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী সর্বজন শ্রদ্ধেয়।

আমি একবার আন্দরকিল্লা কোহিনূর প্রেসে গিয়েছিলাম আমার শ্রদ্ধেয় জেঠামহাশয়ের একটা এনভেলাপ পৌঁছে দিতে। আমি খালেদ সাহেব কোনজন জেনে নিয়ে, উনার হাতে এনভেলাপটা দিলাম। উনি এটা দেখে আমাকে খুব সাবলীলভাবে জিজ্ঞেস করলেন তুমি প্রিন্সিপাল পি আর বড়ুয়ার কি হও? আমি বললাম ভাইপো। ঠিক আছে উনাকে বলবে খালেদ সাহেবের হাতে দিয়েছ। এই কথাটা আমার খুবই ভালো লেগেছে এবং এখনও মনে আছে কারণ অনেকে ঠিক আছে বলে নিয়ে রেখে দেয় কিন্তু উনি যে নিজেই রিসিভ করেছেন, সেটা বলার জন্য আমাকে বলে দিল। আর একবার একটা অনুষ্ঠানে উনি সভাপতিত্ব করছেন, বৌদ্ধদের অনুষ্ঠান বিকেল পাঁচটার পর শুরু হয়েছে কিন্তু অনেক বক্তা সহজে শেষ হচ্ছে না। যেহেতু খালেদ সাহেব সভাপতি তাঁর বক্তব্য শুনার জন্য দর্শকরাও বসে আছেন। অবশেষে উনি সভাপতির বক্তব্য রাখলেন — এড্রেস করে একটু কিছু বলার পর বললেন "অনেক্ষণধরে সভা চলছে, মাঝখানে আমি একবার ওয়াশরুমেও গিয়েছি। আপনারা অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন। সভাপতি হওয়ার এই একটা সুবিধা, চুপ চাপ বসে থাকা যায় আবার অনেকের ভাল ভাল কথাও শোনার সুযোগ হয়। তবে আজকের সভায় মনে হয়েছে আর সভাপতি নয়, যেভাবে কোমর এবং মেরুদণ্ড ব্যাথা হয়ে গেছে"। হলভর্তি সবাই বলে উঠল, ঠিক আছে দারুণ বলেছেন। উনার গাম্ভীর্যতা, সরল, সাবলীল, দৃঢ় ও মার্জিত শব্দ চয়ন সবাইকে আকর্ষণ করে। এভাবে তিনি চট্টগ্রামের সবার প্রিয় সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তিনি নির্লোভ অনাড়ম্ভর জীবন যাপন করতেন। তিনি কত শত সম্পাদকীয় কলাম লিখেছেন, লিখেছেন কত কত প্রবন্ধ কিন্তু কখনও বই আকারে প্রকাশ করার চিন্তা করেননি শুধুমাত্র ১৯৬৬ সালে "সৌদি আরবে পঁয়ত্রিশ দিন" নামে একটা বই প্রকাশ করেছিলেন এই জন্য যে, তিনি সৌদি সরকারের আমন্ত্রণে আরব ভূমি সফর করেছেন যাতে দেশের মানুষ জানে। ১৯৯৫ সালে দৈনিক আজাদী'র পঁয়ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে একটি অপূর্ব শ্রেষ্ঠ সংকলন "হাজার বছরের চট্টগ্রাম"।

তিনি ১৯৪৯ সালে মামাত বোন আমেনা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসার জীবনে ছয় সন্তানের মধ্যে দুই কন্যা ও চার পুত্র সন্তান। কিন্তু তৃতীয় সন্তান বা প্রথম পুত্র জমির দুরারোগ্য রোগে ২০০৩ সালের ২০ নভেম্বর মারা গেলে তিনি খুব ভেঙে পড়েন এবং শোক সামলাতে না পেরে ছেলের মৃত্যুর একমাস পর ২১ ডিসেম্বর ২০০৩ তিনিও পরপারে চলে যান। পুত্র জমিরের অকাল মৃত্যু ও স্বামীর মহাপ্রয়াণে আমেনা বেগমও গভীরভাবে মূহ্যমান হয়ে পড়েন এবং তিনিও ২০০৫ সালের ২৫ জুলাই চিরবিদায় নেন।

মৃত্যুর পর মোহাম্মদ খালেদের জানাজা ও দাফন রাউজানের সুলতানপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে সম্পন্ন হয়েছিল, যা তাঁর গ্রামের সঙ্গে গভীর মমত্ববোধ ও সম্পর্কের প্রমাণ বহন করে। জীবদ্দশায় তিনি চট্টগ্রামের সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে অসংখ্য সংবর্ধনা ও সম্মাননা লাভ করেন। বিশেষত দৈনিক আজাদীর দীর্ঘ সম্পাদকীয় নেতৃত্বের জন্য তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের "প্রবীণ সম্পাদক" ও "জনমতের অভিভাবক"।

তিনি চট্টগ্রামবাসীর জন্য তিনটি ক্ষেত্রে স্থায়ী বড় কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন — চট্টগ্রামে আধুনিক আঞ্চলিক সাংবাদিকতার ভিত্তি নির্মাণ করে গেছেন যা জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতার মহিমায় মহিমান্বিত। মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি, সাংস্কৃতিক ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায় সক্রিয় ভূমিকা। দৈনিক আজাদীকে একটি শক্তিশালী জনমত-প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর। সাংবাদিকতার ইতিহাসে যদি কয়েকজন সর্বাধিক প্রভাবশালী সম্পাদককে নির্বাচন করা হয়, তবে চট্টগ্রামের অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ নিঃসন্দেহে প্রথম সারিতে থাকবেন। তাঁর পরিচয় শুধু একজন সম্পাদক নয়; তিনি ছিলেন শিক্ষক, রাজনীতিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজের অন্যতম নির্মাতা।

দৈনিক আজাদী'র প্রতিষ্ঠাতা সহযোগী হিসাবে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন চট্টগ্রামের সাংবাদিকতার এক যুগপ্রবর্তক ব্যক্তিত্ব, আঞ্চলিক সাংবাদিকতার পথিকৃৎ যিনি সংবাদপত্রকে কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজ-নির্মাণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বাংলাদেশ সরকার ২০১৯ সালে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় জীবনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা "স্বাধীনতা পুরস্কার ২০১৯ (মরণোত্তর)" প্রদান করে।

তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে জি ই সি মোড় সংলগ্ন রাস্তায় 'মোহাম্মদ খালেদ চত্বর' ও চট্টগ্রাম একাডেমি প্রত্যেক বছর "অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশু সাহিত্য পুরস্কার" প্রদান করেন।

ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক ও অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ — দুই প্রজন্মের এই দুই কীর্তিমান মানুষ কেবল একটি সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন চট্টগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ, মুক্তচিন্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গণমানুষের চেতনার দুই উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। একজন স্বপ্ন দেখেছিলেন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের, অন্যজন সেই স্বপ্নকে লালন করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

আজ যখন প্রতিদিন ভোরে হাতে 'দৈনিক আজাদী' তুলে নিই, তখন শুধু একটি সংবাদপত্রই পড়ি না; অনুভব করি দুই মহৎ মানুষের দীর্ঘ সাধনা, ত্যাগ, আদর্শ ও দায়বদ্ধতার উত্তরাধিকার। তাঁদের কর্মময় জীবন আমাদের শেখায় — প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণে নয়, মানুষের মনন, মূল্যবোধ ও চেতনার বিকাশে নিহিত। তাই ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক ও অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শুধু ইতিহাসের অংশ নন, তাঁরা আমাদের বর্তমানের প্রেরণা এবং ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। আমাদের চেতনায় তাঁরা চিরস্মরণীয় ও চিরবরণীয় হয়ে থাকবেন।

গভীর শ্রদ্ধাভরে তাঁদের স্মরণ করি। তাঁদের কর্ম, আদর্শ ও স্বপ্ন নতুন প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকুক, আর সেই আলোয় আলোকিত হোক আমাদের সমাজ, আমাদের চট্টগ্রাম, আমাদের বাংলাদেশ।

লেখক পরিচিতি: প্রাবন্ধিক, সংগঠক ও প্রাক্তন ব্যাংক কর্মকর্তা।