লেখার নীড়
← সব লেখায় ফিরে যান

অনন্য এক মহান সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের

৩ মার্চ, ২০২৬শ্রদ্ধাঞ্জলিধর্ম

চোখের দৃষ্টি যখন কোন বস্তুর উপর গিয়ে পড়ে তখন সেই বস্তুটি আমরা দেখতে পাই। আর যেটা দেখতে পাই না বা যেখানে দৃষ্টিশক্তি যায় না তা আমরা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করি অর্থাৎ যেখানে আলো নেই সেখানে অন্তর দিয়ে দেখতে হয়। রবীঠাকুরের ভাষায় — "চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে, অন্তরে আজ দেখব যখন আলোক নাহিরে"।

মানুষের মাঝে সাধারণত দুইটি সত্তার অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে। একটি সত্তা আমরা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে বাহ্যত দেখি বা উপলব্ধি করি, আরেকটি সত্তা হচ্ছে যা উপলব্ধি করি মন দিয়ে যেটা আমরা চোখে দেখি না। আমরা যখন কোন ব্যক্তির সান্নিধ্যে আসি তখন তাঁকে আমরা সম্মুখে দেখতে পাই, আলাপচারিতায় তাঁকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করি। আর যখন কাছে বা সম্মুখে আসি না তখন দূর হতে উপলব্ধি করি মাত্র। অনেক সময় কল্পনা প্রসূত অনেক ধারণা আমাদের চোখের সামনে আসে, মনের মধ্যে জাগে।

বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সম্মানিত সভাপতি একুশে পদক প্রাপ্ত প্রয়াত মহামান্য সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরের সান্নিধ্যে যাঁরা আসেন নি তাঁরা কখনই বুঝতে পারবে না তিনি কত মহৎ প্রাণের অধিকারী ছিলেন, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন বৌদ্ধ নেতা ছিলেন। যাঁর মাঝে ছিল না ভোগস্পৃহা, ছিল না কোন উচ্চ বিলাসিতা। অকাতরে যিনি মানুষের কল্যাণ সাধন করতেন। সর্বদা সারাক্ষণ যিনি মানুষের কথাই ভাবতেন। তিনি পরম মমতায় অনাথ শিশুদের মানুষ হিসাবে গড়ে তুলেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন সমাজে। স্নেহ ও ঔদার্যের মাধ্যমে মানুষকে কাছে টেনে নিয়েছেন। আতিথ্য ও আপ্যায়নে জয় করেছেন মানুষের মন। জীবনের ব্রত হিসাবে নিয়েছেন মানবতাকে, জীবনের দর্শন হিসাবে নিয়েছিলেন মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধন, পরোপকার ও মানব জাতীর উন্নয়ন।

মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের তাঁর জীবন সায়াহ্নে বলেছিলেন আমার দুই শিষ্য প্রাণপ্রিয় শুদ্ধানন্দ ও সুগতানন্দ আমার সুখের জন্য অনেক কিছুই করছে, আমি আশীর্বাদ করি তারা আরও গৌরব লাভ করুক। সমাজ ও সদ্ধর্মের জন্য কাজ করুক। কিন্তু সুগতানন্দ মহাথের অল্প সময়ের মধ্যে প্রয়াত হলে সমস্ত গুরু দায়িত্ব এসে পড়ে সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরর উপর। তিনি মহামান্য মহাসংঘনায়কের অসমাপ্ত সমস্ত কাজ সমূহ সম্পন্ন করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য বুদ্ধগয়ায় বাংলাদেশ বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ, মুন্সিগঞ্জে অতীশ দীপংকরের বাস্তুভিটায় অতীশ দীপংকর স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ, ঢাকার ধর্মরাজিকা মহাবিহারকে এক অনন্য সুন্দর দৃষ্টিনন্দন মহাবিহার হিসাবে অসাধারণ উন্নয়ন সাধন। একই সাথে বৌদ্ধ সমাজ, ধর্ম, কৃষ্টি ও সভ্যতাকে বিশ্ব দরবারে এক উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

গুরুর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্বশীলতা সর্বোপরি পরোপকারের পথ অনুসরণ করে শুদ্ধানন্দ মহাথের মানবতার কল্যাণে, সমাজের উন্নয়নে একে একে সব কিছুই করেছেন, সৃষ্টি করেছেন সম্প্রীতির এক অনন্য বন্ধন। নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছেন আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসাবে। তাই গুরু যেমন মহাসংঘনায়ক হিসাবে বরিত হয়েছেন, তিনিও একই পদে বরিত হয়েছেন। পেয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক "একুশে পদক"। হয়েছেন বিশ্ববরেণ্য মানবতাবাদী বৌদ্ধ নেতা যা সমাজে খুবই বিরল।

আমি ব্যক্তিগতভাবে সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ ভান্তের সান্নিধ্য আসি ২০১১ সালে। তারও আগে ২০০৬ সালে আমার বাসায় এক সংঘদানে ভান্তেকে ফাং করি। তৎকালীন যুব এর সভাপতি ও বর্তমান বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের যুগ্ম মহাসচিব বাবু দেবপ্রিয় বড়ুয়ার সহযোগীতায় সংগঠনের মহাসচিব সহ অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা — আমার বাসায় আতিথ্য গ্রহন করেছিলেন। এ সংঘদানে এসে ভান্তে খুব খুশী হয়েছিলেন এবং আমাকে আশীর্বাদ করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে দেবপ্রিয় বাবু আমার অফিসে এসে বললেন, "ভান্তে তোমাকে যুব এর সাধারণ সম্পাদক হিসাবে চাচ্ছে"। কিন্তু আমি বিনয়ের সাথে বলি, ব্যাংকে চাকরি করে এ গুরু দায়িত্ব হয়ত আমাকে দিয়ে সম্ভব হবে না। তাই দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করি। ২০০৯ সালে আমি একবার ধর্মরাহিকায় যাই। ভান্তেকে বন্দনা করে কুশল বিনিময়ের পর তিনি তার দুই/একটা উপহার সামগ্রী যা বিভিন্ন সময় পেয়েছেন তা আমাকে আনন্দ সহকারে দেখাচ্ছেন। এক পর্যায়ে একটা ছাবাক (ভিক্ষা পাত্র) দেখিয়ে বললেন, গতকাল এক 'থাই' উনাকে দান করেছেন। দেখতে খুব সুন্দর ভিক্ষা পাত্রটি, আমি বললাম ভান্তে আমি কিছু দান দিচ্ছি এই পাত্রে। উনি খুব পুলকিত হলেন এবং এরই মধ্যে যত লোক ভান্তের সামনে এসেছেন সবাইকে বললেন আমি এই পাত্রে প্রথম দান দিয়েছি। আমি যেন এ দানের পুণ্য প্রভাবে ভান্তের কাছে অত্যন্ত স্নেহ ভাজন হয়ে গেলাম।

২০১১ সালে সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ যুব এর পটপরিবর্তন অর্থাৎ দীর্ঘদিন যাবত প্রায়-১৫-১৬ বছর ধরে যাঁরা যুব এর সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তাঁদের পদ পরিবর্তন হচ্ছে। তাই একটা উৎকণ্ঠা/উৎসাহ সবার মাঝে বিরাজমান ছিল যে, কে হচ্ছে 'যুব' এর সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক? একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ ভান্তে আমাকে ফোন করলেন, বললেন — আমি আপনাকে একটা দায়িত্ব দিচ্ছি। আমি আপনাকে 'যুব' এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিলাম। আমি দুঃসাহস করে জিজ্ঞাসা করলাম, ভান্তে আমি ব্যাংকে চাকরি করি, আমি কি পারব? তাছাড়া সভাপতি কে? উনি ফোনের অপর দিক হতে বললেন, সভাপতি হচ্ছে আপনার বন্ধু 'শুদ্ধানন্দ মহাথের' ধন্যবাদ রাখছি, এ বলে ফোন ছেড়ে দিলেন।

আমি যুব এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলাম। আর সেই হতে আমার অন্যতম প্রিয় ব্যক্তিত্ব হলেন সভাপতি সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের। যখনই ঢাকা গিয়েছি ভান্তের আতিথেয়তা ও স্নেহ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি অনেক সময় নিজের হাতে কপি বানিয়ে সবাইকে খাইয়েছেন অত্যন্ত আনন্দ সহকারে। প্রতি মুহূর্তে খবর নিতেন চা খেয়েছি কিনা ভাত খেয়েছি কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের হাতে তুলে দিয়ে খাওয়াতেন। সংঘনায়ক ভান্তের এ ধরনের স্নেহ পরায়ণতা আমাদের জীবনে এক বিরল প্রাপ্তি। তাঁর এই মহানুভবতা আজ আমাদের প্রতিমুহূর্তে ভাবিয়ে তুলছে।

২০১৮ সালে আমি কেন্দ্রিয় কমিটির প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হই। সেই সুবাদে সংগঠনের কারক সভার মিটিং বা ঢাকার যে কোন অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করি। বিগত ১৫ই জানুয়ারি, ২০২০ সালে ভান্তের জন্ম জয়ন্তীতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল কিন্তু এবার অনুষ্ঠান সীমিত আকারে হওয়ায় যাই নি। পরবর্তীতে ২৩ শে ফেব্রুয়ারী মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ ভান্তের জন্ম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি। চলে আসবার সময় সভাস্থল হতে উঠে যখন ভান্তেকে বন্দনা করছি তখন তিনি বুকে জড়িয়ে ধরে এই বলে বিদায় দিলেন আসেন গিয়ে, যা স্মৃতিতে চিরদিন অম্লান থাকবে। এত আন্তরিকভাবে তিনি বুকে টেনে নিয়েছিলেন তা কোন দিন ভুলবার নয়। এটাই ভান্তের সাথে শেষ দেখা। অর্থাৎ ২৩ শে ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ভান্তের সাথে দেখা করে চলে আসলাম। আর ৩রা মার্চ ভান্তে চির বিদায় নিলেন।

তিনি সবসময় ঐক্যের কথা বলতেন, সেই ঐক্য দল কুল নিকারের ভিত্তিতে নয়, মানবতা, মনুষ্যত্ব, আন্তরিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ হতেই আমরা স্ব স্ব অবস্থান থেকে যেন সামাজিক ঐক্য গড়ে তুলি। তিনি বলতেন আমাদের মধ্যে মতের ঐক্য, পরিকল্পনার ঐক্য ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঐক্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়। সৃজনশীল যে কোন সামাজিক কাজের জন্য ঐক্য অপরিহার্য। তিনি সবাইকে সৌভ্রাতৃত্ব বোধ ও সম্প্রীতির মাধ্যমে সমাজ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর হাত সবসময় প্রসারিত থাকত মানবতার কল্যাণে।

তিনি অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন চিন্তায় চেতনায়। তাঁর অন্তরে সবসময় বিরাজমান ছিল জ্ঞানময় কল্পনা, সৃজনশীলতার স্বপ্ন। তাই তিনি দক্ষতার সাথে তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছেন। বুদ্ধি বিবেচনায় তিনি ছিলেন মহৎ। মানসিক শক্তি ও সাহসে তিনি অনিঃশেষ, বিস্ময়কর ও প্রশংসাযোগ্য। কর্মে দেবদূত, ধারণা শক্তিতে দেবতা সদৃশ, আত্মশক্তিতে বলিয়ান শ্রেষ্ঠ বীর্যবান মহাপুরুষ। তাই তার অসীম সাহসিকতার সামনে সকলেই ছিলেন নতজনু।

সাংগঠনিক যে কোন কাজে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, আবার মানবিকতায় তিনি ছিলেন ঋজু, মানুষের কল্যাণে সদা ব্যাপৃত। তাঁর এই ব্রহ্মচর্য জীবন যেন অনাথের মুখে দু'বেলা ভাত সংস্থানের জন্য, তাঁদের শিক্ষায় শিক্ষিত হিসাবে গড়ে তুলে আলোকিত মানুষ হিসেবে পড়ে তোলার জন্য। তাই কবির ভাষায় বলি — "কোন আলোকে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস"।

এই মহাপুরুষগণ এ ধরায় আসেন তাঁদের কর্ম দিয়ে এ পৃথিবীকে আলোকিত করার জন্যে। তাঁদের এই কর্ম প্রতিভা, এ স্বল্প জীবন প্রবাহের পরিধিকে অনন্ত কালের রূপ দেয়। তাই তাঁরা কর্মের মাধ্যমে মৃত্যুকে জয় করে হন মৃত্যুঞ্জয়ী। সংসারে যারা নিপিড়ীত বঞ্চিত, মানুষ হয়েও মানুষ যাদের চোখের জলের হিসাব নেয় না, সেই সব নিপিড়ীত গরীব দুঃখী মানুষের সন্তানদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষার দায়িত্ব নিয়ে তাদের মানুষ করার জন্য শুদ্ধানন্দ মহাথের নিরলস চেষ্টা চালিয়েছেন, প্রায় তিন শতেরও অধিক-ধর্মরাজিকার ছাত্র পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। তাই তিনি অনাথের পিতা। আজ তিনি নির্বান পথের যাত্রী, ইহলোক ত্যাগ করেছেন, হয়ত তাঁর এই দেহের সাথে তাঁর এই জীবনের সমস্ত ক্লান্তি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে কিন্তু তাঁর কর্ম আমাদের মানসপটে চিরজাগরূক হয়ে থাকবে। তাই আমাদের চেতনায় মননে শুদ্ধানন্দ মহাথের একজন মানবতাবাদী, পরোপকারী শৌর্যবীর্যে অত্যন্ত সাহসী দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন, অপ্রতীম স্নেহ পরায়ন অনন্য এক মহান সংঘনায়ক।

সব্বে সত্তা সুখীতা ভবন্তু।

লেখক পরিচিতি: প্রীতিশ রঞ্জন বড়ুয়া প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ কেন্দ্রিয় কমিটি। সাংগঠনিক সম্পাদক চট্টগ্রাম অঞ্চল। দি ওয়ার্ল্ড বুড্ডিষ্ট আউট স্ট্যান্ডিং লীডার এওয়ার্ড প্রাপ্ত, ডব্লিউ এফ বি ওয়াই-থাইল্যান্ড। দি ওয়ার্ল্ড এলায়েন্স অব বুড্ডিষ্ট লিডার্স এওয়ার্ড থাইল্যান্ড এবং মহাত্মা গান্ধী পিস এওয়ার্ড প্রাপ্ত একজন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠক।