লেখার নীড়
← সব লেখায় ফিরে যান

কষ্টার্জিত সঞ্চয়ই দুর্দিনের সহায়ক শক্তি

৫ জুন, ২০২৬সমাজঅর্থনীতি

যারা চাকরিজীবী বা মাসিক আয়ের উপর নির্ভর করে সংসার চালান সঞ্চয় শব্দটি তাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সঞ্চয় বলতে বর্তমান আয়ের একটি অংশ ব্যয় না করে ভবিষ্যতের প্রয়োজনের জন্য আলাদা করে রেখে দেওয়াকে বোঝায়। ভবিষ্যতের প্রয়োজন বা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য পূরণের জন্য এই অর্থ খরচ করা যায়। একজন মানুষ এক মাসে কত টাকা আয় করেন এবং কত টাকা ব্যয় করেন তার উপর নির্ভর করে সঞ্চয়। যদি আয়ের চেয়ে ব্যয় কম হয়, তাহলে সঞ্চয় করা সম্ভব। যদিও বলা হয়, যা কিছু আয় করবে তার তিন ভাগের এক ভাগ জমা রাখবে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। কারণ আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ স্বল্প আয়ের এবং যা আয় করেন তা দিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। বাসা ভাড়া, পড়ালেখার খরচ, চিকিৎসা খরচ, যাতায়ত খরচ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সবকিছু মোকাবেলা করে টাকা জমানো খুব কষ্টকর। তারপরও শত কষ্ট, শত ঝামেলার মধ্যেও আপনার যদি সঞ্চয়ের মানসিকতা থাকে তাহলে কিছুটা হলেও সঞ্চয় করা সম্ভব।

যাদের নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস আছে, অল্প অল্প করে হলেও সঞ্চয় করেন তারা দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল পায়। সঞ্চয়ের ফলে আর্থিক ভিত মজবুত হয় এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা যায়। অনেকে দশ, বিশ, পঞ্চাশ, একশো টাকা করে মাটির ব্যাংকে জমা করেন। আবার অনেকে ব্যাংক, বীমা, মোবাইল আর্থিক সার্ভিস, ফাইন্যান্স কোম্পানি বা নিরাপদ অন্য কোনো মাধ্যমে টাকা জমা রাখেন, এই জমাকৃত অর্থই সঞ্চয়।

এখন আপনি আপনার উপার্জন থেকে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের পর সঞ্চয় করবেন যেভাবে — প্রত্যেক মাসে যা বেতন পান সেই টাকা হতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা করে রাখা অর্থাৎ প্রত্যেক মাসে ফিক্সড সেভিংস করতে পারেন। যা বেতন পান তা থেকে সংসারের যাবতীয় খরচের পর অবশিষ্ট টাকা জমা করলে তাকে বলা হয় উদ্বৃত্তাংশ সঞ্চয় অর্থাৎ আপনি মাসের শেষে যা অবশিষ্ট থাকে তাই সঞ্চয় করতে পারেন। আর যারা লক্ষ্য নির্ধারণ করে সঞ্চয় করেন অর্থাৎ আগামী এক বছরের মধ্যে দুই বা পাঁচ লক্ষ টাকা জমাতে হবে এই চিন্তা করে, যখন যা পারেন তাই জমা করেন এবং এক বছরের মধ্যে লক্ষ্য পূরণ করেন তাদেরকে বলা হয় লক্ষ্যভিত্তিক সঞ্চয়কারী (টার্গেট সেভার)।

যারা চাকরি জীবনের শুরুতে টার্গেট সেভিংস করতে পারেন তাদের জন্য সঞ্চয়ের দরজা খুলে যায়। যেমন আপনি টার্গেট সেভিংস করে বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা জমালেন। উদাহরণস্বরূপ এখন সেই টাকা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে প্রতি মাসে ট্যাক্স, ভ্যাট ইত্যাদি কাটার পর পাঁচ হাজার টাকা করে মুনাফা বা সুদ পাচ্ছেন। এই পাঁচ হাজার টাকা প্রত্যেক মাসে কিস্তি দিয়ে নতুন একটি সঞ্চয় স্কিম খুলতে পারেন।

পারতপক্ষে কোন ধরনের লোন না করাই ভাল। অনেক সময় লোন শোধ করতে গিয়ে মানুষ ফতুর হয়ে যায়। যারা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন তারা খুব সচেতনতার সাথে ক্রেডিট কার্ডের ব্যাবহার করা উচিত। ব্যাংকিংয়ে একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে — "লোনস ক্রিয়েট ডিপোজিটস"। আপনি এই পাঁচ লক্ষ টাকার এফডিআর বন্ধক (মর্টগেজ) রেখে লোন নিয়ে সেই টাকা আবার এফডিআর করে রাখলেন।

কিছু ক্ষেত্রে নতুন এফডিআরের মুনাফা দিয়ে ঋণের কিস্তির একটি অংশ পরিশোধ করা সম্ভব হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে খুব সতর্ক ও হিসাবি (ক্যালকুলেটিভ) হতে হয়। মনে রাখবেন, যে কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সুদের হার, লোনের সুদ ও এফডিআর সুদের পার্থক্য, কর, ভ্যাট এবং মূল্যস্ফীতির মতো বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় আনতে হয়।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত আমাদের মূল্যস্ফীতি ছিল সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৯.৫%। এবার বাজেটে তা কমিয়ে ৭.৫% লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যেমন আপনার কাছে এখন ১,০০,০০০ টাকা আছে। এই মুহূর্তে যে জিনিসটা এক লক্ষ টাকায় পাবেন, মূল্যস্ফীতি ৭.৫% ধরে একই জিনিস কিনতে পরের বছর লাগবে ১,০৭,৫০০ টাকা। আপনি ব্যাংকে টাকাগুলো জমা রাখলেন। ব্যাংক যদি কোনো লাভ (সুদ বা মুনাফা) না দেয়, তাহলে বাস্তবে সেই ১,০০,০০০ টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। যদি ব্যাংক বছরে ৫.৫% হারে লাভ দেয়, তাহলে প্রকৃত হিসাবে আপনার ক্রয়ক্ষমতা ২% (৭.৫%-৫.৫%) কমে যায়। আবার যদি ৯% লাভ দেয় তাহলে প্রকৃত অর্থে আপনার সঞ্চয়ের মূল্য বাড়ে ১.৫%। একইভাবে যারা চাকরিজীবী তারা একবছর চাকরি করার পর যদি বেতন না বাড়ে বা মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেতন কম বাড়ে তাহলে তাদের প্রকৃত আয় কমে যায়। এক্ষেত্রে তাদের সঞ্চয় দূরের কথা, জীবন যাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তারপরও একটা কথা আছে "সেভ সামথিং ফর রেইনি ডে"। স্বল্প আয়ের লোক বা যাদের সঞ্চয় করার মত অবস্থা নেই, তারাও বিভিন্নভাবে সঞ্চয় করতে পারেন। "Cost cutting" বা "খরচ কমানো" বলে একটা কথা আছে। আপনি কিছু কিছু খরচ কমাতে পারেন। এই খরচ কমাতে হলে আপনাকে কৃচ্ছ্রতা সাধন করতে হবে। একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে "কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে" যেমন — আয় ও ব্যয়ের হিসাব করে চলতে হবে। অনেক সময় এক টাকারও হিসাব করতে হয়। একথা মাথায় রাখতে হবে যে, এক টাকাও কম থাকলে সেটিকে এক হাজার টাকা বলা যায় না। আপনাকে বলতে হবে নয় শত নিরানব্বই টাকা। ভবিষ্যতে লাগবে এই চিন্তা করে কোন জিনিস অহেতুক কিনবেন না। মার্কেটে বা মেলায় গেলে কোন জিনিস খুব পছন্দ হয়েছে কিনতে ইচ্ছা করছে, সে জিনিসটা ঐ মুহূর্তে না কিনে পরে কিনব বলে চলে আসুন। কোনকিছু কেনার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন — "এটি কি সত্যিই এখন দরকার?" এতে অনেক অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমে যায়। বাইরে অযথা ঘুরাঘুরি করা বা বাইরের খাবার কিনে না খাওয়াই ভালো। যেখানে হেঁটে যেতে পারবেন সেখানে ভাড়ায় গাড়ি চড়ে যাবেন না।

যারা মনে করেন তারা একদমই সঞ্চয় করতে পারবেন না, তারাও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সঞ্চয় করতে পারেন। ধরুন আপনি এক কেজি মিষ্টি কিনবেন, কিন্তু কিনবার সময় আপনি একটা মিষ্টি কম নেন, এতে করে আপনি অন্তত কিছু টাকা সাশ্রয় করতে পারেন। ধরুন বাজার থেকে আটশ টাকায় এক কেজি চিংড়ি মাছ কিনবেন মনস্থির করেছেন কিন্তু কিনবার সময় এক কেজির পরিবর্তে ৯০০ গ্রাম কিনলেন; এতে আপনার প্রায় ৮০ টাকা সাশ্রয় হতে পারে। ভাত রান্না করার জন্য চাল মেপে নেওয়ার পর সে চাল ধোয়ার আগে এক মুঠো চাল তুলে নিয়ে ঐ চাল আলাদা করে জমাতে থাকেন।

অফিসে বোনাস পাবেন তাই আগে থেকেই লোন করে কোন খরচ করবেন না। যদি টিউশনি করেন বা অফিসে ওভারটাইম করে আয় করেন তাহলে সেই টাকা জমা রাখার চেষ্টা করুন। সুযোগ থাকলে পার্ট-টাইম কাজ, ফ্রিল্যান্সিং, হাতের কাজ বা ছোট ব্যবসার মাধ্যমে বাড়তি আয় করতে পারেন যা আপনার সঞ্চয়কে ত্বরান্বিত করবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে "সঞ্চয়ে সম্বৃদ্ধি আনে পূণ্যে আনে সুখ, আলস্য দারিদ্র্যতা আনে পাপে আনে দুখ"। স্বল্প আয়ের এবং খেটে খাওয়া মানুষের জন্য সঞ্চয় করা কঠিন, কিন্তু সঞ্চয়ের মানসিক চেতনা জাগ্রত রেখে নিয়মিত ছোট ছোট পদক্ষেপ নিলে ধীরে ধীরে ভালো সঞ্চয় গড়ে তোলা সম্ভব। কবিগুরুর কথায় যদি বলি "বিন্দু বিন্দু জল, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা — একদিন মহাসাগরের সৃষ্টি করে।" তেমনি ভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ও একসময় বড় আকার ধারণ করবে এবং এই কষ্টার্জিত সঞ্চয়ই হবে দুর্দিনে আপনার সহায়ক শক্তি।

লেখক পরিচিতি: প্রাবন্ধিক, সংগঠক ও প্রাক্তন ব্যাংক কর্মকর্তা।