নেতৃত্ব বিকাশে সুবর্ণ শিখা পরিষদ
প্রত্যেক গ্রামেই বিহারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্ম পরিচালিত হয়। ছোটকাল হতে আমরা দেখে আসছি আমাদের গ্রামের সার্বজনীন বিহারকে কেন্দ্র করে সমস্ত সামাজিক ক্রিয়া কর্ম পরিচালিত হতে। এই বিহারকে কেন্দ্র করে যাবতীয় কাজকর্ম পরিচালনার জন্য গড়ে উঠেছে সমিতি বা সংগঠন। পিংগলা গ্রামেও এমন একটি সামাজিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল যার নাম 'পিংগলা প্রবাহ (পি পি)'। এই 'পিংগলা প্রবাহ' পিংগলা গ্রামের চীবরদান অনুষ্ঠান সহ খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিচিত্রা, নাটক, দেয়ালিখা প্রকাশ ও সামাজিক বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করত।
আজকাল বিয়ে-শাদি, সংঘদান বা অন্য যে কোন অনুষ্ঠানের জন্য আমরা যাবতীয় জিনিসপত্র ভাড়ায় আনা হয় ডেকোরেশনের দোকান হতে, যেমন — থালা, বাটি, গ্লাস, চামচ, ডেক্সি, কড়াই, সামিয়ানা পর্দা ইত্যাদি। তখন এ সমস্ত জিনিষপত্র ভাড়ায় আনা হত গ্রামের সমিতি হতে। প্রত্যেক জিনিসের গায়ে লিখা ছিল পি পি অর্থাৎ 'পিংগলা প্রবাহ'। এই পি পি তাদের ফান্ড বৃদ্ধি করত এই সমস্ত জিনিসের ভাড়া থেকে প্রাপ্ত টাকা, সদস্যদের বাৎসরিক চাঁদা ও ছেলে বা মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে সমিতির নির্ধারিত চাঁদা হতে। এই পিংগলা প্রবাহ ছিল একটি সমৃদ্ধশালী সংগঠন। আরো একটা সংগঠন ছিল স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে গঠিত যার নাম ছিল "পিংগলা প্রান্তিক সংস্থা"। তারাও বিভিন্ন খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো বিভিন্ন সময়ে। পিংগলা প্রবাহ সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ও বেশ সুখ্যাতিসম্পন্ন ছিল, কেন জানিনা এই রকম একটা প্রতিষ্ঠিত সংগঠনেরও নানান টানা-পোড়ন শুরু হয়। অবশেষে একদিন জেনারেল মিটিং এ এই সংগঠন বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে সার্বজনীন বিহারকে কেন্দ্র করে একটি কমিটি থাকবে যার নাম হবে 'পিংগলা সার্বজনীন বিহার পরিচালনা কমিটি' এবং এই বিহার পরিচালনা কমিটিই গ্রামের সব সামাজিকতা দেখাশুনা করবে।
আমাদের গ্রামের জন্মজাত সন্তান সৌগত ধর্মপাল মহাথের যখন বাংলাদেশ বৌদ্ধ ভিক্ষু মহাসভার ২৭তম সংঘনায়ক নির্বাচিত হলেন তখন গ্রামবাসী তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন। ১৯৯৯ সালে গ্রামের শিশু-কিশোর, যুব-বৃদ্ধ সকলেই সম্মিলিতভাবে এক বিরাট সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, যেখানে এলাকার বিভিন্ন গ্রামকেও সম্পৃক্ত করা হয় এবং এটা ছিল এক ব্যাপক আয়োজন। এই আয়োজনে যে স্মরণিকা প্রকাশিত হয়েছে তার নাম দেওয়া হয় "সুবর্ণ শিখা"। এখানে উল্লেখ্য সংঘনায়ক এস ধর্মপাল মহাথের'র মায়ের নাম ছিল সুবর্ণময়ী বড়ুয়া। এই সংঘমাতার নামের প্রথম শব্দ সুবর্ণ এবং তাঁরই অতিজাত সন্তান সংঘনায়ক ধর্মপাল মহাথের হলেন দেদীপ্যমান আলোকজ্জ্বল শিখা। তাই স্মরণিকার নাম রাখা হল 'সুবর্ণ শিখা'।
অনুষ্ঠান পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ সালের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও সংঘনায়ক ভান্তেকে স্মরণীয় করে রাখার প্রত্যয়ে গ্রামের যুবেকরা সর্বসম্মতিক্রমে একটা যুব সংগঠন গড়ে তোলে যার নাম দেয়া হয় 'সুবর্ণ শিখা পরিষদ'। এই সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হতে গ্রামের যুবেকরা মেধা ও সংস্কৃতির বিকাশে অনেক গঠনমূলক কাজ করে আসছে।
যুব সমাজ হচ্ছে সকল শক্তির উৎস। যুব সমাজ যত শক্তিশালী হবে সমাজ তত সমৃদ্ধ হবে। যুবকদের মনে যে সাহস থাকে সাধারণত যাঁরা প্রবীণ তাঁদের সেই সাহস থাকে না। পরিবার বা সংসার নিয়ে তাঁরা নুয়ে পড়ে। তাই প্রবীণদের দ্বারা অনেক কাজ সম্পাদন করা সম্ভব হয় না, যা যুবকদের দ্বারা সম্ভব হয়। ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি প্রখ্যাত পরমানু বিজ্ঞানী এ.পি.জে আবুল কালাম যুবকদের বিভিন্ন গুণাবলির কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন: যুবকরা হয় অত্যন্ত সাহসী। তাদের থাকে ভিন্ন রকম ভাববার সাহস, আবিস্কার করার সাহস, অপ্রত্যাশিত পথে ভ্রমণের সাহস, সমস্যা মোকাবেলা করে সফল হওয়ার সাহস।
কাজেই যুবকেরা সাহসের সাথে যে কাজে হাত দেয় তাতে সফল হবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে এবং এই সাহসের উপর ভর করেই তারা বদলাতে পারে সমাজের চিরায়ত প্রথাকে, সৃষ্টি করতে পারে নব নব ধারা। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতর ডিগ্রি, স্ব-শিক্ষা বা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজের গতানুগতিক ধারাকে বদলাতে হলে যুবকদের মাঝে লিডারশীপ কোয়ালিটি বা নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। যার জন্য প্রয়োজন বা বেশি বেশি দরকার মানসিক উচ্চাকাঙ্খা, অর্থপূর্ণ কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করা, ভাল বা ইতিবাচক অঙ্গীকার করা, স্পষ্ট বা সংগতিপূর্ণ কাজ করা ও জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং এভাবেই একজন যুবক প্রকৃত সমাজসেবী হয়ে উঠতে পারে। সমাজে যদি দৃঢ়তার সাথে সুন্দর সুন্দর কাজ করা যায়, সমস্যা, সংকট বা কষ্টকে অতিক্রম করে ভাল কাজ করা যায় তাহলে নিজে যেমন আলোকিত হয় তেমনি আলোহীন সমাজকেও আলোকিত করা সম্ভব হয়।
সমাজে সবাই নেতা হতে পারে না বা নেতৃত্ব সবাই দিতে পারে না, অনেকের মাঝে একজন বিশেষ কিছু গুণের কারণে নেতা হয়ে উঠে। নেতৃত্ব এমন একটা গুণাবলী যা অন্যকে আকৃষ্ট করে, অন্যকে তার দিক নির্দেশনা, আদেশ, নির্দেশ ইত্যাদি অনুসরণ করতে স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতি জাগায় এবং তার কথায়-কাজে, উপস্থিতিতে সকলে প্রভাবিত হয়, তার প্রতি সকলে আকৃষ্ট হয়, তাকে অনুসরণ করে এবং এভাবেই তার নেতৃত্বের বিকাশ ঘটতে থাকে।
আবার যারা নেতৃত্ব দেন তাদের উচিত অন্যের মতামতকে সম্মান দেখানো। কারণ একজন নেতার একটি সার্বজনীন লক্ষ্য বা টার্গেট থাকে যা তার সাথে থাকা অন্য সকলের মেধা, সৃজনশীলতা ও শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, এতে দেখা যায় একজন ভাল নেতার সাথে ভাল কর্মীও সৃষ্টি হয় এবং সকলের সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ ঘটে। নেতার সব সময় তার কর্মীদের মোটিভেট করার ক্ষমতা রাখতে হয়। তার কাজ-কর্ম, কথাবার্তা, উপস্থাপনা এমন সুন্দর হবে যাতে সকলে তার নির্দেশনা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। যেমন ফুলের অনেক বৈচিত্রতা বা রঙের জৌলুশ আছে। দূর থেকে দেখে মনে হবে অনিন্দ্য সুন্দর শোভা বর্ধন করছে। কিন্তু সব ফুল মানুষের মনকে আকৃষ্ট করতে পারে না। যে ফুল সৌরভ ও সুগন্ধ ছড়িয়ে মানুষের মন ভোলায় সেই ফুলই সার্থক। কাজেই ফুলের মত যুব সমাজকে সার্থক হতে হবে। এজন্য চাই শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মে-ধ্যানে ও বিভিন্ন কার্যকলাপের মাধ্যমে নিজেদের ব্যাপ্তি প্রসারিত করা।
যুবকদের হতে হবে ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন ও সচেতন। একথা মনে রাখতে হবে যে, ভগবান বুদ্ধের দর্শনের মূল ভিত্তি হল নৈতিকতা ও যুক্তি। তাই যুক্তিগ্রাহ্য নয় এমন যে কোন কাজ হতে বিরত থাকতে হবে এবং হতে হবে চারিত্রিক ভাবে সুদৃঢ়। সঠিক ধর্মচর্চার মাধ্যমে নিজেদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে যেমন সামনের দিকে এগুতে হবে তেমনি গ্রামের মানুষদেরও সে লক্ষের দিকে নিয়ে যেতে হবে, তাহলেই হবে একটি সমৃদ্ধশালী সমাজ। যারা সুবর্ণ শিখা পরিষদ করছে আমি মনে করি তারা আলো হাতে সামনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তাদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবে নতুন নতুন নেতৃত্ব।
এই সুবর্ণ শিখার প্রাক্তন অনেকেই এখন গ্রামের বিহার কমিটিকে কেন্দ্র করে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভবিষ্যতেও এই যুব নেতৃত্বই হবে আলোর দিশারী। তাদের নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে সভ্যতা, তাদের চিন্তাধারা হবে সুদূর প্রসারী এবং এই যুবকরাই সৃষ্টি করবে সুন্দর নতুন আগামী। যুগোপযোগী অম্লান আলো জ্বালানো সকল সৃজনশীল যুবকদের জন্য রইল আমাদের বুক ভরা ভালোবাসা। যুব শক্তির জয় হউক।
ভবতু সব্ব মঙ্গলম।
লেখক: সমাজ সচেতন ও সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব, ওয়ার্ল্ড ফেলোশিপ অব বুড্ডিষ্ট লিডার্স অ্যাওয়ার্ড থাইল্যান্ড, ওয়ার্ল্ড এলায়েন্স অব বুড্ডিষ্ট অ্যাওয়ার্ড থাইল্যান্ড, মহাত্মা গান্ধী পিস অ্যাওয়ার্ড ও ড. ভীমরাও আম্বেদকর অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত। গ্রাম: পিংগলা।