তরুণদের বিদেশমুখিতা: কারণ, অস্থিরতা ও করণীয়
একটি দেশের অগ্রগতির মূল ভিত্তি হচ্ছে শিক্ষা। যে দেশের মানুষ যত বেশি শিক্ষিত, সে দেশ তত বেশি উন্নত। তাই শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সেজন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী, সর্বজনীন ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বলা যায় বৈষম্যমূলক এবং পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত নয়। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি একদিকে মাদ্রাসাশিক্ষা, অন্যদিকে বহুমুখী ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা, পাঠদানের ধরন, তথ্যপ্রযুক্তির অভাব ও নানাবিধ কারণে যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে, তাদের মধ্যে একধরনের ভবিষ্যত-অনিশ্চয়তা কাজ করে।
বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে বিদেশে পড়াশোনা বা কাজ করার আগ্রহ প্রবল হওয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক অস্থিতিশীলতা, শিক্ষাব্যবস্থা, ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিদেশে থাকা বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতদের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে যখন তরুণরা ইন্টারমিডিয়েট পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে থাকে, তখনই তাদের মধ্যে একধরনের হতাশা কাজ করে — কোথায় ভর্তি হতে পারবে, প্রত্যাশিত বিষয়ে পড়তে পারবে কি না, যে বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে, সে বিষয়ে পড়ে ভবিষ্যতে কী করতে পারবে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন তাদের মনে ঘুরপাক খায়।
একজন ছাত্র যখন দেখে, ভালো ফল করেও ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায় না, ভালো চাকরি পাওয়া কঠিন, চাকরিতে প্রবেশের পর বেতন ও ক্যারিয়ার প্রোগ্রেশন সীমিত, তখন সে বিদেশকে 'বিকল্প ভবিষ্যত' হিসেবে মনে করতে শুরু করে। আবার সিনিয়র ভাই, আগের প্রজন্মের কেউ, পরিবার, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুরা বিদেশে গিয়ে সফল হলে তাদের দেখেও বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালো রাস্তা, ভালো গাড়ি, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, পছন্দের বিষয়, প্রত্যাশিত ক্যারিয়ার, উন্নত বেতন কাঠামো, নিয়ম-শৃঙ্খলা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ও তরুণদের আকৃষ্ট করে।
বর্তমান সময়ে মা-বাবার মধ্যেও বিদেশমুখী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার এখন সন্তানদের বলে —
"দেশে কী করবে? বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা কর।"
অর্থাৎ বিদেশে যাওয়াটা শুধু ছাত্রের নিজের স্বপ্ন নয়; অনেক ক্ষেত্রে পরিবারেরও লক্ষ্য হয়ে গেছে — কীভাবে সন্তানকে বিদেশে পাঠানো যায়। এই ধরনের মানসিক পরিবর্তনের অন্যতম কারণ দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা, সামাজিক অস্থিরতা, দেশের আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদি।
মা-বাবারাও দেখেন, সামাজিকভাবে তাদের অনেক বন্ধু, ভাই, আত্মীয়স্বজন বিদেশে গিয়ে ভালো উন্নতি করেছেন, যা দেশে থাকলে হয়তো সম্ভব হতো না। এই পারিপার্শ্বিক অবস্থাও বিদেশ যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করে।
একজন তরুণ যখন দেখে, ভালো পড়াশোনা করেও ভালো চাকরি পাওয়া যায় না, আরও বেশি পড়াশোনা করার ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ সীমিত, সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ও নিয়োগের ক্ষেত্রে সংকীর্ণ মানসিকতা, স্বজনপ্রীতি ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে — তখন সে অস্থির হয়ে ওঠে। কী করে বিদেশে যাওয়া যায়, সেই চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ে। তখন তারা গভীরভাবে ভাবতে থাকে দেশের ভবিষ্যত নিয়ে। চোখেমুখে অন্ধকার দেখার মতো অবস্থায় মনে হয় —
"এখানে আমার কী হবে?"
তখন দেশের নিয়ম-কানুন, বিশ্ববিদ্যালয়, বিষয়, ক্যারিয়ার ও চাকরি — সবকিছুর প্রতি একধরনের আস্থাহীনতার ভাব তৈরি হয়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, যত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়া যায় ততই ভালো; এখানে কিছুই হবে না, যেভাবেই হোক বের হয়ে যেতে হবে।
এই ধরনের চিন্তা যখন কাজ করে, তখন বিদেশ যাওয়ার আগ্রহ প্রবল হয়ে ওঠে। বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা যত বাড়তে থাকে, দেশের সমস্যা নিয়ে হতাশাও তত বাড়ে; আবার দেশের সমস্যা নিয়ে হতাশা যত বাড়ে, বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছাও ততই বাড়তে থাকে। ফলে তরুণরা আরও অস্থির হয়ে ওঠে।
তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় — বিদেশে গিয়ে যেকোনো বিষয়ে পড়বে, যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, বিদেশে চাকরি করবে; যেকোনোভাবে দেশ ছাড়তেই হবে।
এ ছাড়া একই শিক্ষা ও পরিশ্রমের বিনিময়ে বিদেশে বেশি আয় করার সম্ভাবনা এবং উন্নত জীবনযাপনের সুযোগও অনেক তরুণকে আকর্ষণ করে।
দেশের মধ্যে কোনো তরুণ একটি ভালো চাকরি পেলেও সে চাকরির ভবিষ্যত নিশ্চয়তা বা পাঁচ-দশ বছর চাকরি করার পর কোন স্তরে পৌঁছাবে, তার একটি পরিষ্কার চিত্র অনেক সময় দেখতে পায় না। অনেক সময় লবিং, চ্যানেল, স্বজনপ্রীতি, তোষামোদ প্রভৃতি কারণে পারফরম্যান্সের চেয়ে পারসেপশন ক্যারিয়ার মূল্যায়নে বেশি কার্যকর হয় — যা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
তরুণরা চায়, দক্ষতা ও পারফরম্যান্স অনুযায়ী যেন সবক্ষেত্রে সুযোগ পাওয়া যায়। পরিচয়, সুপারিশ বা অন্যান্য অপ্রাসঙ্গিক বিষয় যেন ক্যারিয়ারে বাধা না হয়। ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে অসম প্রতিযোগিতাও অনেক সময় তাদের হতাশাগ্রস্ত করে তোলে।
এ দেশে ক্যাডারভিত্তিক চাকরি খুব আকর্ষণীয়। অনেকে প্রচুর পড়াশোনা করে এই ক্যাডার চাকরি লাভ করে। কিন্তু চাকরি করার একপর্যায়ে এসে যখন দেশের সরকার পরিবর্তন হয়, তখন নানা কারণে চাকরিজীবীদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসতে পারে — এমন আশঙ্কাও তরুণদের মধ্যে কাজ করে। আবার বদলির সমস্যাও রয়েছে। এসব কারণে মেধাবী তরুণরা আইনের শাসন, নিরাপত্তা, পরিবেশ প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় বিদেশ পাড়ি দিতে আগ্রহী হয়।
বিশেষ করে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উন্নত ল্যাবরেটরি, গবেষণা, অধ্যাপনা ও আন্তর্জাতিক গবেষণার সুযোগ — অর্থাৎ উন্নত শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে চলে যায়। তারা এ কথাও ভাবে, বিদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করে কিছু আয় করার সুযোগ আছে, যা আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। তাদের প্রত্যাশা থাকে একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, স্বাধীন ও নিরাপদ ব্যক্তিগত জীবন।
এ ধরনের বিদেশমুখী অবস্থা থেকে তরুণদের ফিরিয়ে আনতে হলে দেশের শিক্ষা, চাকরি ও নিরাপত্তাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করতে হবে। রাষ্ট্র বা সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজ ও পরিবার — সবাইকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ করতে হবে।
এমন দেশ তৈরি করতে হবে, যেন সন্তানেরা ভাবে — বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন আছে, কিন্তু বিদেশে যাওয়াটা বাধ্যতামূলক নয়। এমন বাংলাদেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে একজন তরুণের কাছে বিদেশে যাওয়া হবে একটি সুযোগ (option), কিন্তু দেশত্যাগ নয়।
আমাদের দেশে একজন তরুণ যদি ভাবতে পারে এবং বিশ্বাস করতে পারে যে, আমি ভালোভাবে পড়াশোনা করলে এবং আমার দক্ষতা বাড়াতে পারলে দেশে আমার প্রচুর সুযোগ আছে, তাহলে তার মধ্যে দেশের প্রতি আস্থা তৈরি হবে।
সে যেন নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে —
"আমি যোগ্য হলে অবশ্যই সুযোগ পাব।"
যেকোনো নিয়োগব্যবস্থায় স্বচ্ছ নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ পেশাজীবী বা বিশেষায়িত জনবলের ক্ষেত্রে — যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রিসার্চার, সায়েন্টিস্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপার — যুক্তিসঙ্গত বেতন কাঠামো দরকার। পদোন্নতি ও বেতন যদি পারফরম্যান্স এবং যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার তৈরি করা সহজ হয়।
দেশের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার সুযোগ এবং স্কলারশিপের সুযোগ তৈরি করা উচিত। নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি ভালো বেতন ব্যবস্থা যেমন থাকবে, পাশাপাশি একজন ডাক্তার যেন নিরাপদে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারেন। একজন ইঞ্জিনিয়ার যেন পেশাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা পান। একজন রিসার্চার যেন স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে পারেন। একজন নারী পেশাজীবী যেন নিরাপদে তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। এবং সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ — Professional dignity, অর্থাৎ পেশাগত মর্যাদা।
দেশে ভালো ক্যারিয়ার ও ভালো জীবনব্যবস্থা — দুটো একসঙ্গে দরকার। প্রয়োজন একটি স্বাস্থ্যকর সমাজব্যবস্থা। এ কথা ঠিক যে, উচ্চাকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন কিছু তরুণ অবশ্যই বিদেশে যাবে — উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার জন্য। কিন্তু বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে যেন তারা দেশে ফেরার তাগিদ অনুভব করে। এর জন্য দেশের মধ্যে এমন বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি দেশে নিজেরও ভবিষ্যত দেখতে পারে। তারা যেন এমন পরিবেশ দেখতে পায়, যেখানে ভবিষ্যতে তাদের প্রজন্ম সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠতে পারবে। বিদেশে তারা যে সুযোগ-সুবিধাগুলো খুঁজে পায় বলে মনে করে, সেগুলো বাংলাদেশেও তৈরি করতে পারলে বিদেশমুখী চাপ অনেকটাই কমতে পারে। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করা, যেখানে একজন তরুণের সামনে বিদেশে যাওয়ার দরজা খোলা থাকবে, কিন্তু দেশ ছেড়ে যাওয়া তার একমাত্র ভবিষ্যত বলে মনে হবে না।
লেখক পরিচিতি: প্রাবন্ধিক, সংগঠক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা।